ইতিহাস নিয়ে তামাশা বন্ধে আইন চাই
ইতিহাস নিজের মতো করে লেখার চর্চা বহুদিন থেকে চালু আছে বাংলাদেশে । এই বছরদুয়েক আগে পর্যন্ত এই স্বরচিত ইতিহাস সীমাবদ্ধ ছিলো পাঠ্যপুস্তকে, রাজনীতিদের বুলিতে রাষ্ট্রিয় প্রচার যন্ত্রের চাপাবাজিতে । এই ইতিহাস বিকৃতির ক্ষেত্রগুলো ছিলো কিছু ঘটনাকে অস্বীকার (denial) বা কোন ঘটনা নিজের মতো করে সংশোধন (revision) করার মাধ্যমে । নিজামীর দেশে কোন যুদ্ধাপরাধী নেই দাবি প্রথম প্রকারের উদাহরন হিসেবে দেখা যায় । স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করেনি – এটা দ্বিতীয় প্রকারের উদাহরণ ।
ইতিহাস বিকৃতির এই চর্চা একমাত্র বাংলাদেশেই চালু নেই । ইউরোপ জুড়ে এই চর্চা চালু আছে অনেকদিন ধরে । তবে ইওরোপ থেকে বাংলাদেশের পার্থক্য হলো ইওরোপ তাদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের একটা আইনী ব্যবস্থা ইতিমধ্যে দাড় করাতে পেরেছে এবং সেইসাথে যুদ্ধাপরাধীদের উত্তরসুরিরা যুদ্ধাপরাধীদের গণহত্যা বিষয়ে কোনপ্রকার বিকৃতি চালু করতে না পারে সেটার জন্যও তারা আইন করেছে । সাধারণভাবে একে গথহত্যা অস্বীকারের বিরুদ্ধে আইন (Law Against Holocast Denial) বলা হয় । আসুন একটু নজর বোলানো যাক এসকল আইনের দিকে ।
Edit দেশআইনের নামকি বলা আছে সেখানে শাস্তি অস্ট্রিয়াNational Socialism Prohibition Law (1947, amendments of 1992)ন্যাশনাল সোশালিস্টদের গণহত্যার ইতিহাস অস্বীকার বা তাদের অপরাধ হালকা করা চেষ্টা, অন্য কারো করা এ জাতীয় কাজ সমর্থন অথবা ন্যাশনাল সোশালিস্টদের কোন কাজের বৈধতা খোঁজার কোন চেষ্টা কোন ধরনের মিডিয়ায় প্রকাশ করা যাবে না । ১ থেকে ১০ বছর কারাদন্ড বেলজিয়ামNegationism Law (1995, amendments of 1999)জার্মানির ন্যাশনাল সোশালিস্ট আমলের গণহত্যার ব্যাপ্তি হালকা করা চেষ্টা, সমর্থন, বা বৈধতা দানের সকল চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ ।৮দিন থেকে ১ বছর কারাদন্ড ও সেইসাথে ২৬ থেকে ৫ হাজার ফ্রাঙ্ক জরিমানা । চেক রিপাবলিকLaw Against Support and Dissemination of Movements Oppressing Human Rights and Freedoms (2001)নাতসি বা কমিউনিস্ট গণহত্যার ইতিহাস অস্বীকার, সন্দেহ, অনুমোদন/স্বীকৃতি বা তাদের কাজের বৈধতা দেবার চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ ।৬ মাস থেকে ৩ বছরের কারাদন্ড জার্মানি130 Public Incitement (1985, Revised 1992, 2002, 2005)জনসমক্ষে ন্যাশনাল সোশালিস্ট আমলের অপরাধসমূহ অস্বীকার, সমর্থন বা তাদের অপরাধ লঘুকরণের চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে । এসংক্রান্ত কোন সিম্বল প্রচার ও প্রদর্শন করাও দন্ডনীয় অপরাধ ।৫ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড এবং/অথবা জরিমানা লুক্সেমবুর্গCriminal Code, Act of 19 July 1997১৯৪৫ সালের আন্তর্জাতিক ওয়ার ক্রাইম ট্রাইবুনালে ঘোষিত যুদ্ধাপরাধ অস্বীকার, সমর্থন, লঘুকরণের প্রচেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ ।৮দিন থেকে ৬ মাস কারাদন্ড রোমানিয়াEmergency Ordinance No. 31 of March 13, 2002 গণহত্যার ইতিহাস অস্বীকার শাস্তিযোগ্য অপরাধ । রেসিস্ট, জেনোফোবিক বা ফ্যাসিস্ট সিম্বল প্রচার করা দন্ডনীয় অপরাধ ।৬ মাস থেকে ৫ বছর কারাদন্ড (কিছু আইনসঙ্গত অধিকার রহিতকরণসহ) পোল্যান্ডAct of 18 December 1998 on the Institute of National Remembrance১৯৩৯ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত ন্যাশনাল সোশালিস্ট বা কমুনিস্টদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক তথ্যে দ্বিমত শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে ।তিন বছর পর্যন্ত কারাদন্ড ও/অথবা জরিমানা ফ্রান্সLAW No 90-615 to repress acts of racism, anti-semitism and xenophobia (1990)১৯৪৫-এর লন্ডন চার্টার এর আওতাভুক্ত অপরাধসমূহের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ বা প্রশ্ন উত্থাপন শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে ।১ মাস থেকে ১ বছর বা জরিমানাতথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া
মোটাদাগে বলতে গেলে উপরের তালিকার দেশগুলোতে গণহত্যার ইতিহাসকে বিকৃত করা, গণহত্যার আকার সীমিত করে দেখানোর চেষ্টা, পুরো গণহত্যার ঘটনার উপর অবিশ্বাস/সন্দেহ প্রকাশ, গণহত্যাকারিদের ব্যবহৃত চিহ্ন ব্যবহার বা প্রচার (জার্মানি ও রোমানিয়া), গণহত্যা হালাল করার চেষ্টা সবগুলোই আইনত দন্ডনীয় অপরাধ ।
পশ্চিম থেকে অনেক হাবিজাবি অপসংস্কৃতি শিখতে পারলেও অপরাধীকে বিচারকের সামনে দাড় করাতে হবে এই সামান্য জিনিসটুকু আমরা শিখতে পারিনি । স্বাধীনতার পর এতগুলো বছর পার হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা যায় নি । গণখুনিরা বহাল তবিয়তেই আছেন এখনো । রিভিশন, ডিনায়ালের পর এবার তারা নতুন করে ইতিহাস লেখার আয়োজন করছেন । এরই একটা উদাহরণ হলো সম্প্রতি রাজাকার মুজাহিদের বক্তব্য । এঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে জামায়াতের এক সভায় তিনি দাবি করেছেন -
“আমরা স্বাধীনতা এনেছি, আমরাই তা রক্ষা করব”
আমাদের দুর্ভাগ্য যে একটা স্বাধীন দেশে বসে এই জাতীয় অপলাপ শুনতে হয় । আমরা তাদের রাজনীতির অধিকার দেই । আমরা আমাদের সভাস্থলগুলো তাদের বিষোদ্গারের জন্য ভাড়া দেই । তাদের তৈরী ব্যবসা-শিক্ষা-চিকিতসা প্রতিষ্ঠানে দরকারমতো ধর্না দেই ।
এইসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়তো হবে অথবা হবে না । এমনও হতে পারে বিচার প্রক্রিয়া টেনে লম্বা করতে করতে তাদের অধিকাংশই পটল তুলবে । রয়ে যাবে তাদের ঔরসে জন্ম নেয়া কালসাপগুলো । “বিশেষ ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় স্বাধীন” এই দেশে ঐ কালসাপগুলোই ভবিষ্যতে বিষ ছড়াবে ।
এই বিষ ঠেকানোর জন্য চাই আইন । যে আইন আমাদের ইতিহাস বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করবে । এই আইনের দাবি শুরু হোক এখন থেকে, এখান থেকে ।
নোট: একই সাথে সচলায়তনে প্রকাশিত ।
