Text

ভোখেনব্লাট – ৫

১.
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মুষলধারে বরফ পড়ছে । স্প্রিং, ফলের (বসন্ত, শরৎ) মতো সুন্দর ঋতু থাকতেও আমার কেন যেন শীতকালটাই ভালো লাগে এখানে । আমার প্রথম বরফ দেখাও জার্মানিতে । পরিস্কার মনে আছে সেদিনটা ছিলো ১১ নভেম্বর ২০০৪ । বিদেশে নতুন । যা দেখি সেটাতেই তব্দা খাই । ১১ তারিখ কি এক কাজে ইউনিভার্সিটির ৫ তলায় উঠে ব্যালকনিতে তাকিয়েই খেয়াল করলাম বাইরে তুষারপাত শুরু হয়েছে । সাথের পাকিস্তানি বন্ধুও কোনদিন বরফ দেখেনি । দুজনে ব্যালকনিতে দাড়িয়ে হা করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষন । বড়বেলায় এরকম বিস্ময় নিয়ে কোন জিনিস এভাবে দেখেছি বলে মনে পড়ে না ।এই বিস্ময় মেশানো মুগ্ধতা গত তিনটা শীতে কাটেনি । একারনে শীতকালে তুমুল তুষারপাতে মাঝে মাঝে বেরোতে ভালোই লাগে । বিস্মিত হবার সুযোগ বড় একটা আসে না এই যাপিত জীবনে । জার্মান কলিগরা শুনে খুব অবাক হয় এরকম শাইযে ভেটার আমি পছন্দ করি শুনে । আরে ব্যাটা শাইযে ভেটারের দেখেছিস কি তোরা ? শুধু যদি তোরা আমাগো দ্যাশের বন্যা সাইক্লোন একবার দেখতি .. শুধু যদি একবার দেখতি তোরা .. ।

২.

আমাদের সময় সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের জীবনের শেষ তিনটি চিঠি ছাপিয়েছে । মৃত্যুর দিন (১১ অগাস্ট ২০০৪) বা তার আগের দিন এ পরিবারের সদস্যদের কাছে এ চিঠিগুলো লেখেন তিনি । যাদের চোখ এড়িয়ে গেছে তাদের জন্য লিংক

মঙ্গলবার ১৩ নভেম্বর ২০০৭

সকালে উঠে কম্পিউটারের মনিটরের দিকে তাকিয়ে মনে পড়লো আজ আমার জন্মদিন । দেশে থাকতে ভালো খারাপ কোনরকমে জন্মদিনটা কোনরকমে পার করে দেয়া যেতো । ১৫ বছর আগে যে কিশোরী আমার প্রতিটা জন্মদিনে উইশ করবে বলে কথা দিয়েছিলো তার কথা মনে করে মন একটু খারাপ হলেও মোটের ওপর ভালোই কাটছিলো জন্মদিনের দিনগুলো । বাইরে এসেই বিপত্তি বেধেছে । এখানে যাবতীয় জায়গায় নামের সাথে জন্মতারিখটা হলো বড় পরিচয় । সেসব যায়গায় যে জন্মতারিখটা লেখা থাকে সেটা আমার আসল জন্মতারিখ না। এখনকার যুগে অবস্থার একটু উন্নতি হলেও সেকালে আমি যে স্কুলে পড়তাম সেখানে স্যারেরাই ঠিক করতেন আমি কোন দিনে জন্মেছি । ক্লাস নাইনে এসএসসি পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন করার সময় ক্লাস টিচার ঠান্ডু কাশেম (আরেকজন ছিলো গরম কাশেম, বাচ্চা কাচ্চা পোলাপাইনরে পিটায়া তক্তা বানানোর জন্য ঐ লোকের সুনাম ছিলো) আমাদের বললেন জন্মতারিখের ঘরটা ফাকা রাখতে । আমরাও রাখলাম । পরে যখন রেজিস্ট্রেশন কার্ডটা হাতে পেলাম তখন দেখলাম আমার বয়স ১৩ মাসের কিছু বেশী কমেছে । অর্থাৎ, ১৩ নভেম্বর ৭৬ এর বদলে সেটা ২৫শে ডিসেম্বর ৭৭ হয়েছে । আমাদের এই বলা হলো যে বিসিএস দেবার সময় এটা নাকি কাজে লাগবে । তখনকান দিনে বিসিএস আর আর্মিই ছিলো মধ্যবিত্তের স্বপ্নের জায়গা । প্রাইভেট সেক্টর তখনও ডেভেলপ করেনি। তো বিসিএসের নাম শুনে ভালো মানুষের মতো মেনে নিলাম এই ভেবে যে মুরুব্বিরা যা করে ভালোর জন্যই হয়তো করে । কয়েকদিন পরে মুরুব্বি স্যারেদের প্রতি শ্রদ্ধা আরো বাড়লো যখন দেখলাম আশে পাশের কিছু স্কুলে পড়া বন্ধুদের সবার জন্মদিন গণহারে ১লা জানুয়ারী ৭৭/৭৮ হয়েছে । রীতিমতো হাসির পাত্র তখন তারা । ওখানকার স্যারেদের মাথায় এই অবাস্তব চিন্তা কিকরে খেললো সেটা আমি আজও বুঝতে পারি না । আমাদের ব্যাচ বা আশেপাশের ব্যাচে এরকম অনেককে পাওয়া যাবে যাদের এরকম পহেলা জানুয়ারিতে জন্ম । আমাদের অনেকের মুরুব্বিরাই আমাদের এভাবেই দুর্নীতিতে হাতেখড়ি দিয়েছেন । এই আমরাই যদি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন না হই তাহলে হবেটা কে !

তো এই দুইরকম জন্মদিনের কারনে জন্মদিনের সময়টা আমি সাধারণতঃ কোথাও ডুব মেরে থাকি এখানে । সাইবার যুগে জন্মদিন লুকানো আসলে সম্ভব না । ফেইসবুক, লিঙ্কডইন, হাই5, ফ্রেন্ডস্টার ইত্যাকার হাবিজাবি থেকে মানুষজন সহজেই জন্মদিনের খোজ পেয়ে যায় । কয়েকবার এরকম প্রশ্নের মুখোমুখিও হতে হয়েছে যে আমার জন্মতারিখ আসলে কোনটা । ইওরোপিয় ভদ্রতার আড়ালে প্রশ্নটা হলেও সেটা আমাকে যথেষ্টই বিব্রত করে । সকালে কামলা দেবার জায়গায় গিয়েও দেখলাম আমার জন্মদিনের ব্যাপারটা চাউর হয়ে আছে । একেকজন এসে উইশ করে আর আমি আতঙ্কের সাথে তাদের মুখ দেখে বোঝার চেষ্টা করি অন্য জন্মদিনের খবরটা তারা ওয়াকিবহাল কিনা । ভাগ্য সদয় ছিলো যাহোক এবার । কেউ প্রশ্নটা তোলেনি ।

এরকম শুভেচ্ছা দিয়ে ওপাড়া এপাড়ায় সহব্লগাররা পোস্ট দিয়েছেন । মুকুল ভাই ও অছ্যুৎ বলাইকে এজন্য বিশেষ ধন্যবাদ । মুকুল ভাই তার পোস্টে সেই পোস্ট পছন্দ করি কিনা সেটা নিয়ে ভয়ে ছিলেন । ফেইসবুকে ইশতিয়াক রউফ একই আতঙ্কে ছিলেন । অনুমান করি ফেইসবুক এ্যাকাউন্টে আমার প্রোফাইল পিকচার দেখে উনাদের এই ধারনা হয়েছে । তাদেরকে জানাতে চাই যে ঐ মেসেজটা শুধু ফেইসবুকের জন্য । পুলাপাইন ছবি, ফ্ল্যাশ, হাবিজাবি দিয়া খুবি ত্যক্ত করে । ঐজন্যই ঐ ঘোষণা । কমরেড সুমন চৌধুরী, আনোয়ার সাদাত শিমুল, ইমরুল হাসান, অমিত, সুজন চৌধুরী, প্রকৃতিপ্রেমিক, কনফুসিয়াস, এস্কিমো, বিবর্তনবাদী, শওকত হোসেন মাসুম, নাজিমউদ্দিন, কুদরত আলী, নিজের আয়না, সাইফুর, আহমেদ শরফুদ্দিন, নরাধম, শাহেদুর রহমান, অচেনা বাঙালি, অন্যরকম, বিহংগ, তবুও একাকি, মানুষ, প্রশ্নোত্তর, মনিটর, জোনাকি, প্রত্যুতপন্নমতিত্ব, মাথামোটা, প্রচেত্য, ছায়ার আলো, রাশেদ, বন্ধনহীন, তীরন্দাজ, শাওন, মাহমুদ রহমান, সারওয়ার চৌধুরী, নাজিরুল, সুশান্ত, শাহেদুর রহমান, রিজভী, জেবীন, আনিকা, ললিতা, নীলাঞ্জনা, তবুও একাকি, মানুষ সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ এপাড়া ওপাড়া মিলিয়ে পোস্টদুটিতে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য ।

এপাড়ার জন্মদিনের পোস্ট পড়তে গিয়ে প্রথমেই দেখলাম অছ্যুৎ বলাই তার পোস্টে ভুল করে একটা ছবি পোস্ট করেছেন যেটাতে দেখা যাচ্ছে একটি বাচ্চা মেয়ে হাপুস হুপুস করে আনন্দের সাথে একটা কেক খাচ্ছে । এই ভুল ঢাকার জন্য অছ্যুৎ বলাই মিথ্যার আশ্রয় নেয়ায় তার জন্য বরাদ্দ ভার্চুয়াল কেকের অর্ধেকটা প্রত্যাহার করে নেয়া হলো । সেই সাথে ইন্ধন দেবার অপরাধে মাহবুব লীলেন, থার্ড আইয়ের জন্য কেকের সাথে কোকের বদলে পানি সুপারিশ করলাম । এপাড়ার মতো, ওপাড়ায়ও মিথ্যার হাত থেকে আমার পবিত্র জন্মদিনটি রেহাই পায়নি । ব্লগার মম দাবি করেছেন এ জন্মতারিখটাও নাকি ভুয়া ! তিনি নাকি আমার জন্মের সময় ছিলেন সেখানে ! যাইহোক মমকে আজকে সন্ধ্যায় ঘন্টা দুই সময় দেবার জন্য সাধারণ ক্ষমার আওতায় আনা হলো । ১৮ তারিখে তার জন্য আগাম জন্মদিন । ১৬ তারিখে মুকুল ভাইয়ের জন্মদিন । তাকেও শুভেচ্ছা । এপাড়ার আরেক বটবৃক্ষ নজমুল আলবাবের জন্মদিনও এমাসেই । শুভ জন্মদিন নজমুল আলবাব । আরোও যেসব পুরনো বন্ধুদের জন্মদিন এ মাসে তাদেরকেও শুভ জন্মদিন । উহারা সুখে থাকুক ।

এসএম মাহবুব মোর্শেদ অনেক দিন বেঁচে থাকার জন্য আশির্বাদ করেছেন । তাকে বলি, আমি অনেকদিন বেঁচে থাকতে চাই না । চোখের সামনে প্রিয়জনদের চলে যাওয়া দেখতে হবে তাহলে । সেটা বড় কষ্টের ব্যাপার হবে । এ কষ্টটা পেতে চাই না । ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন মা, আমায় তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে’ তাদের তরফে শুভ জন্মদিন । ফারুক ওয়াসিফ, এতো সহজে ফিরিয়ে নেবো না নিজেকে । নিশ্চিত থাকবেন ।

আর সবার মতো হিমুও জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন । তবে সেইসাথে জানতে চেয়েছেন বাসায় শুকনো কাথা আছে কিনা । তাকে আমি বিনয়ের সাথে জানাতে চাই যে হিমুর দরকারে বান্দা হাসিব সবসময় হাজির । হিমুর দরকারে কাথা নতুন করে বানিয়ে দেয়া হবে ।

গুরুজী নিধিরাম সর্দার আশা করেছেন আমি পটকা মরিচের মতো ফুলে গিয়ে ফাইটা যামু । জন্মদিনে গুরু কি চামে বদদোয়া দিলো কিনা বোঝা গেলো না ।

মৈথুনানন্দ এক ফাকে মুকুল ভাইয়ের পোস্টে জেনেফারকে ফোন দিতে বলেছেন । বিশিষ্ট এক মহিলা ব্লগারের এক পোস্টেও তিনি এধরনের শিবের গীত গেয়েছেন । তার অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে এই নামে কোন মেয়েকে আমি কোনদিন দেখিনি বা এ নামে কারো সাথে পরিচয় নাই । ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করার অপচেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ জানালাম সেই সাথে ।

সাইফুর সাহেব দোয়া করেছেন অনেক বড় হবার । সেইসাথে আবার ৬ ফুটের বেশী বড় যাতে না হই সেটার সতর্কবানী দিয়েছেন । আমি তাকে জানাতে চাই যে অনেককাল ধরেই এক ইঞ্চি কম ৬ ফুট উচ্চতায় আটকে আছি । এক ইঞ্চির জন্য ৬ ফুটি হওয়া গেলো না এই আক্ষেপ আমার অনেকদিনের ।
জেনারেল লোহার খাটের শুভেচ্ছা দিয়েছেন । মানে পুরা ভেজাইল্লা শুভেচ্ছা । দিলে দিবো সেগুন কাঠের শুভেচ্ছা। তা না দিয়া রট আয়রণ দিয়া কাম সারনের চিন্তা । তীব্র নিন্দা জানাই । কুদরত আলিও সমপরিমান অশ্লীল শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন । একসহস্র হুর পাঠাবে নাকি সে আমার জন্য ! অস্তাগফেরুল্লাহ.. । লানত পড়ুক পোড়া মুখগুলোতে ।
ব্লগের মতো ফেইসবুকেও অনেকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন । মাহবুব সুমনকে ধন্যবাদ সবার আগে ট্রেন ধরার জন্য। জন্মাবার দুইদিন আগেই উনি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন । আরোও ধন্যবাদ অনুজ মুনতাসির হাসান ও জিকোকে । ধন্যবাদ জুয়েল, সহব্লগার মাহবুব মোর্শেদ, সহপাঠি কামরুল হাসানকে (অলৌকিক হাসান) ।

মৌসুমকে বিশেষ ধন্যবাদ দুছত্রের দারুন শ্লোকটির জন্য । মৌসুম ছড়া কবিতা লিখলে ভালো করতেন মনে হয় । সিংহপুর থেকে মনে করে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য টিয়াকেও ধন্যবাদ । যদ্দুর মনে পড়ে এক যুগ ধরে পরিচয় থাকলেও এবারই প্রথম জন্মদিনের শুভেচ্ছা ছিলো এটি । টিয়া ও কমরেড নাসরিন সিরাজ এ্যানি ফেইসবুকে ফ্রি গিফট পাঠিয়েছেন বলে আলাদা ধন্যবাদ । ফেইসবুকে কোনরকম গিফট নেব না বলে প্রতিজ্ঞা করায় গিফটগুলো দেখা হয়নি । মাইন্ড খাবে না ওরা আশা করি । ছোটবোন মুনিয়াকেও ধন্যবাদ মনে করে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য । ভালো থাকো মুনিয়া এই কামনা করছি ।

লেইটলতিফ আনিকাকেও ধন্যবাদ ট্রেন মিস করে হলেও জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য ।

মেইলে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন হোসেইন, এস্কিমো, অমিত, আরণ্যক যাযাবর । জন্মদিনের উপহার হিসেবে একশত হুরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আরণ্যক । সায় দিয়েছেন অমি রহমান পিয়াল । সময় হলে কড়ায় গন্ডায় আদায়ের প্লানটা মাথায় টুকে নিলাম। হাসান রায়হান এরকমই হুর পরিবেষ্টিত এক কৃষ্ণের ছবি পাঠিয়ে আমার জীবন সেরকম হোক সেটা কামনা করেছেন । ছবিতে এক সরোবরে হুরদের সাথে কৃষ্ণ জলকেলি করছেন সেটা দেখা যাচ্ছে । (সঙ্গত কারনে সেটা এখানে শেয়ার না করা হলেও ছবিতে যা দেখলাম সেটা বলছি) । ছবির সরোবরটি শ্যাওলায় পরিপূর্ন । পানি পুরোটাই সবুজ । জায়গাটা ম্যালেরিয়ার মশা প্রজননের উৎকৃষ্ট স্থান সেটা বলাই বাহুল্য । মশার শুককীট মুককীটের সাথে সেখানে দুচারটা ব্যাঙ পরিবার থাকাও বিচিত্র কিছু না । এহেন সরোবরে মশা মাছি ব্যাঙের সাথে জীবন কাটানোর কামনায় মোটেও খুশি হতে পারলাম না বলে দুঃখিত ।

যাইহোক, সারাদিন ব্যস্ততা আর অদ্ভুদ এক মন খারাপে কাটলো । অদ্ভুদ একারনে যে এই মন খারাপের কোন বোধগম্য কারন নেই । এমন না যে দেশে থাকতে জন্মদিন কাটতো বিশাল কেক কেটে হুলস্থুলভাবে । সত্যি কথা বলতে কি দেশে খুব অল্প লোকজনই আমার জন্মদিনটা সঠিকভাবে জানতো বা জানার আগ্রহ রাখতো । নিজেরও অনিচ্ছা ছিলো এসব ফালতু উদযাপনে । কেন জানি সারাদিন ধরে অফিসে বসে করে মুখ গোমড়া করে মেইল মেসেজ পড়লাম । বাসে করে বাসায় ফেরার পথে এই মন খারাপের ডায়োগনিসই করছিলাম। রাস্তায় দেখা এক পুরনো আরবাইটসকলেগিনের সাথে । আমাকে দেখে এতো হৈচৈ করে উঠলো যে খানিক বিব্রতই হলাম । গোমড়ামুখো ডয়েশে মানভর্তি সবাই একনজর দেখলো কি হচ্ছে । বিব্রত হলেও সাথে সাথে বুঝলাম সারাদিনের মন খারাপের কারন । দেশে যে অবস্থায়ই থাক সারাদিন কোন না কোন খুশিমুখ দেখতাম । সেইসব খুশিমুখই শান্তিতে রাখতো আমাকে যেটা আমি এখানে ভয়ানক মিস করি । কৃতজ্ঞতা কলেগিন, আমারে দু’দন্ড শান্তি দেবার জন্য ।

বুধবার ১৪ নভেম্বর ২০০৭

আজ সকাল থেকেই টের পেলাম ধেয়ে আসা সাইক্লোনের খবরটা চাউর হয়েছে মিডিয়ার কিছু অংশে । সারাটা দিন গেলো সাইক্লোন সিডরকে ফলো করতে করতে । সাইক্লোনের ব্যাপকত্য আমরা আগে বুঝতাম কয় নাম্বার সিগনাল পড়েছে সেটার ওপর । রেডিও টিভি পত্রিকায় ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখলেই । তো ইদানিং এ নামটা অর্থাৎ স্কেলটার একটু পরিবর্তন হয়েছে । ইংরেজীতে ক্যাটাগরি ১, ২, থেকে সর্বোচ্চ ৫ পর্যন্ত সাইক্লোনের মাত্রা বেঁধে দেয়া হচ্ছে । এটাকে সাফির-সিম্পসন (Saffir-Simpson) স্কেল বলা হয় । সাফির সিম্পসন স্কেলে বাতাসের গতিবেগের ওপর ভিত্তি করে ক্যাটাগরাইজ করা হয় ।

সিডর (Sidr) নাম পাওয়া ধেয়ে আসা সাইক্লোনটি সারাদিন শক্তি সঞ্চয় করে রাতে ক্যাটাগরি-৫এ গিয়ে ঠেকলো । বাংলাদেশে প্রাকৃতিক কারনে শতাব্দির সবচেয়ে ভয়ানক মানবিক বিপর্যয়ের কারনও এরকম এক সাইক্লোন । সেবার ভয়াবহ জলচ্ছাসের কারনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমানও ছিলো বেশী । ১৯৭০এর এই সাইক্লোনের তৎকালীন কোন নাম না থাকলেও এটা এখন ভোলা সাইক্লোন নামে পরিচিত । তৎকালের ইয়াহিয়া গোষ্ঠির সীমাহীন অবহেলায় ৫ লক্ষের মতো মানুষ মারা পড়ে সেবার ।

ফি বছর এই বিপুল মানুষের মৃত্যুর পর ইন্টারন্যাশনাল রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি একটা প্রকল্প তিলে তিলে গড়ে তোলে বাংলাদেশের উপকুলের লোকজন নিয়ে । এটা সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম নামে পরিচিত । ১৯৬৫ সালে এ প্রকল্পের ধারনাটি প্রথম প্রস্তাব করে ন্যাশনাল সোসাইটি (বর্তমানে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি) । এই পরিকল্পনা বাস্তব রূপ লাভ করে স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩ সালে । বর্তমানে এ প্রকল্পের আওতায় নারী পুরুষ মিলিয়ে মোট ৩৪ হাজারের বেশী স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেন । সাথে আইন শৃংখলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী মিলে মোট ৪০ হাজার কর্মি সাইক্লোনের সতর্কিবার্তা মানুষের কাছে পৌছে তাদের ঝুকিপুর্ন এলাকা থেকে সরিয়ে নেবার কাজ শুরু করেছে । দেখা যাক তাদের এই কর্মযজ্ঞ কতটুকু সফল হয় ।

বৃহস্পতিবার – রবিবার, ১৫ নভেম্বর -১৭ নভেম্বর

১.
হারিকেন সিডর তার চিহ্ন ভালো মতোই রেখে গেছে । প্রাথমিক হিসাবেই হাজারের ওপর মৃত । ক্যাটগরি ৫ থেকে নেমে ল্যান্ডফলের সময় এটা ক্যাটাগরি ৪ নেমে আসে ভাগ্যক্রমে । তীব্রতার দিক দিয়ে ’৭০ বা ’৯১-এর সমকক্ষ হলেও এটা আগেরগুলোর মতো লক্ষাধিক লোকের মৃত্যু ঘটাবে না বলেই এখনো পর্যন্ত মনে করা হচ্ছে । অনেক গুলো কারণ এর পেছনে কাজ করেছে বলে ধারনা করা যায় । আগের চাইতে সচেতন হয়েছে মানুষ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি । তবে সবার ওপরে ছিলো রেড ক্রিসেন্টে স্বেচ্ছাসেবকদের কর্মতৎপরতা । মিডিয়া বলছে ৬ লক্ষেরও বেশী মানুষ তারা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন । আরোও ত্রিশ লক্ষের মতো মানুষ এখনও বিপদ সংকুল এলাকায় থেকে গেছেন । এই ত্রিশ লক্ষ মানুষের ব্যাপারটা ঠিক পরিস্কার না । তারা ঠিক কি ধরনের বিপদ সংকুল পরিবেশে ছিলেন ? তাদের বেশীরভাগই বিপদটা কাটিয়ে উঠলেও ভবিষ্যতে তাদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর বা তারা যেখানে থাকেন সেখানটা আরোও নিরাপদ করে তোলার ব্যাপার দুর্যোগ ব্যবস্থাপকেরা কি ভাবছেন ?

অপটিমিস্টিক চিন্তা অনুযায়ী এরপর এই ত্রিশ লক্ষ বিপদগ্রস্থ মানুষের খুব অল্পই মারা গেছেন । কিছু মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারও হয়েছে পুর্ব সতর্কিকরণের সাফল্যগাথা । কিন্তু স্বভাবে পেসিমিস্টিক আমি একটু প্রশ্ন রাখতে চাই এই যে যারা মারা গেলেন তাদের মৃত্যুও কি ঠেকানো যেত না ?

কিছুদিন ধরেই বিবিসির বাংলা বিভাগের খবর ফলো করছিলাম । বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস তাদের বিভিন্ন ভাষাভিত্তিক বিভাগের সাংবাদিকদের নিয়ে Bangladesh Boat Journey নামে একটি সফরের এক আয়োজন করছিলো । (ছবি দেখুন এখানে) । তো সেই সফরে তারা মাসাধিককাল বাংলাদেশের নদীপথে এমভি অবসর নামে একটি লঞ্চে ঘুরে বেড়িয়েছেন । বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব স্বচক্ষে দেখা ও তা নিয়ে স্থানীয় জনগনের সাথে মতবিনিময়ই ছিলো তাদের উদ্দেশ্য । মংলা ঘুরে উত্তর দিকে এগুচ্ছিলেন তারা । মাঝখানে সাইক্লোনের কবলে পড়ে লঞ্চ ছেড়ে স্থলে আশ্রয় নিতে হয়েছিলো তাদের । সাইক্লোনের শেষে আবার তারা মংলা ফিরে আসেন স্বচক্ষে অবস্থা পর্যবেক্ষনের জন্য । সাইক্লোনের অনেক ফার্স্টহ্যান্ড অভিজ্ঞতা তাদের কাছেই শুনি প্রথম ।
তো আমি তাদের রিপোর্টগুলো ফলো করছিলাম প্রথম থেকেই । সফরের প্রথম দিকে এক পর্যায়ে তারা এক স্কুল দেখতে যান যেটা সাইক্লোন শেল্টার হিসেবে পরিচিত । তারা দেখতে পান সেখানে সে শেল্টারের ছাদ খসে পড়ছে । বেশীরভাগ রুমই পরিত্যক্ত । কয়েকদিন আগে ছাদ থেকে প্লাস্টার খসে পড়ে একজন ছাত্র আহতও হয়েছে সেখানে ! এসব কারনে বলাবাহুল্য স্থানীয় জনগণের কাছে সেটা শেল্টার নামে পরিচিত হবার কারণ নেই । নিশ্চিতভাবেই বলা চলে এরকম আরো অসংখ্য সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে উপকুল জুড়ে যেগুলো শেল্টার দেবার বদলে নিজেই প্রান হরণ করে নিতে পারে ।

cyclone_shelter

কিছু এলাকার লোকজনকে রীতিমতো লাঠিপেটা করতে হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যাবার জন্য । তবুও তারা যাননি অনেকেই । ভিটা মাটি ছেড়ে যেতে চাননা কেউ, কেউ ছোট বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে বের হতে চান না । তো, ভাঙ্গা শেল্টারের পাশাপাশি এ জিনিসগুলোও মৃতের সংখ্যা বাড়ানোর পেছনে কাজ করেছে । আরো কিছু নির্ভরযোগ্য আশ্রয় কেন্দ্র, আরেকটু সচেতনতা আরোও কিছু মৃত্যু নিশ্চিত এড়াতে পারতো ।

এবারের সাইক্লোনটি ভোলা জেলার কিছুটা পশ্চিম দিক দিয়ে সুন্দরবন ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা দিয়ে প্রবেশ করেছে । স্থলভাগে প্রবেশের পর পূর্ব দিকে ভোলা সাইক্লোন থেকে একটু কম বেকে সিলেটের ওপর দিয়ে সেটা বাংলাদেশ অতিক্রম করেছে । এটা একটু ব্যতিক্রম আগের গুলো থেকে । বাংলাদেশে বেশীরভাগ প্রানক্ষয়ি সাইক্লোনের ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছে ভোলা জেলাও তার পূর্বের দ্বীপগুলো । রেড ক্রিসেন্টের সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রামের মূল কার্যক্রম এলাকা (সিপিপি কমান্ড এরিয়া) একারনে সেখানে বেশ ভালো ও ঘনভাবে সন্নিবেশিত । এবারে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা ভোলার পশ্চিমে সিপিপির কর্মকান্ড পুরো উপকুল জুড়ে নেই । তাছাড়া সুন্দরবন অঞ্চলের উপকুলের সাথে ভোলার পুর্বের উপকুলের পার্থক্য হলো এখানে বিপদসংকুল এলাকার মানুষদের উত্তর দিকে পালানোর সুযোগ নেই । দুবলার চর ও তার পাশের বেশ কিছু মাঝিনৌকা এই চেষ্টাটি করেছিলো । বিবিসির সাংবাদিকদের বেঁচে যাওয়া লোকেরা বলছেন সে চেষ্টা খুব সফল হয়নি ।

CPP
ছবিঃ সিপিপি কমান্ড এরিয়া । লক্ষ্য করুন নব্বুই পরবর্তি সময়ে এটা কতটা সামান্য বেড়েছে ।

সিপিপির কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চলে অকিঞ্চিতকর হবার কারনে বেশ কিছু এলাকায় সতর্কবার্তাও পৌছেনি সময়মতো । সুন্দরবন উপকুলে মাঝিরচর নামে এক চরের কথা জানা যায় যেখানে কোন সতর্কবার্তা পৌছোয়নি । আশ্রয় নেয়া বেশীরভাগ জেলেই সেখানে প্রানে বাঁচতে পারেননি । আন্দাজ করা যায় এরকম অসংখ্য চর ও ক্ষুদ্র বসতিগুলোতে সতর্কবানী ছাড়াই মানুষ প্রান হারিয়েছেন ।

সিপিপির আওতা সুন্দরবনের দুর্গম এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে দেবার প্রয়োজনীয়তা একটু আগে বুঝলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান হয়তো আরোও কমানো যেত । সেইসাথে দুর্যোগ ঠেকানোর জন্য বেশী করে মজবুত শেল্টার বানানোটাও অতি আবশ্যিক । অন্য সময় এগুলো শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও কাজে দেবে । আমাদের সরকার বাহাদুরেরা সেতু উদ্বোধন করতেই ৫ কোটি টাকা ব্যয় করেন । এসব জীবন রক্ষাকারী প্রকল্পেই তাদের এতো অনীহা ।

সাইক্লোনের ঝাপটা সরে যাবার পর এখন সবাই মৃতদেহ গোনার কাজে ব্যস্ত । এরপরই আসবে ত্রানের কাজ । হাতে নেয়া সব প্রজেক্টে ফেইল করা ফৌজি শাসকরা সেটাতে কি করে সেটাই দেখার বিষয় এখন ।

২.
সাংবাদিক ও কন্ঠশিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীকে এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে । পত্রিকা মারফত জানতে পারছি তিনি কোমায় আছেন । মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত কারনে তার এই দুর্দশা । সুস্থ হয়ে উঠুন তিনি । মাহমুদুজ্জামান বাবু, বাপ্পা মজুমদার, সঞ্জীব চৌধুরী আমার প্রিয় গায়ক । এর মধ্য কেউ চলে গেলে সত্যিকার অর্থেই দুঃখ পাবো ।

[i](এলেখাটি যখন প্রকাশিত হয় তখন সঞ্জীব চৌধুরী আর আমাদের মাঝে নেই । যেখানেই যান ভালো থাকুন তিনি।)[/i]

টিকা:
১. ভোখেন – সপ্তাহ, ব্লাট – পেপার শিট, পৃষ্ঠা । একত্রে অর্থ সপ্তাহের পৃষ্ঠা/পাতা ।
২. এপাড়া, ওপাড়া
৩. শাইযে ভেটার (Scheisse Wetter) : ইংরেজীতে Shit Weather. বাংলা কি হবে এটার ?
৪. অছ্যুৎ বলাইয়ের পোস্ট , মুকুল ভাইয়ের পোস্ট
৫. ডয়েশে মান – জার্মানির অধিবাসী, আরবাইটসকলেগিন – সহকর্মি (স্ত্রীলিঙ্গ)
৬. ১৩ নভেম্বরের ব্লাটে এই ভিনদেশী কলেগিনের গল্প আরেকদিন হবে । শুভেচ্ছো জানানো সবার নাম এলো কিনা সেটা বুঝতে পারছি না । কারো নাম বাদ পড়ে থাকলে ক্ষমা করবেন ।)
৭. সাইক্লোন শেল্টারের ছবি বিবিসির ফ্লিকার এ্যাকাউন্ট থেকে নেয়া ।

Text

ভোখেনব্লাট – ৬

মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০০৭
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবনটা যে একটু আলাদা সেটা আমি বুঝতে শিখি ক্লাস সেভেনে । আমার এক ক্লাসমেইট ছিলো বৌদ্ধ । দিপংকর নাম ছিলো যতদুর মনে পড়ে । সে আমাদের সাথে সব কাজে থাকলেও খাওয়া দাওয়া করতো একটু আলাদাভাবে । টিফিনের সময় তাকে কখনও আমরা দেখিনি চটপটি-ফুচকা-সিঙ্গাড়া কিনে খেতে । সে সারা বছরই বাসা থেকে আনা কোন সব্জি ভাজির সাথে রুটি খেত । মাছ মাংস না খেয়ে কিভাবে মানুষ থাকতে পারে সেটা খুব অবাক করতো আমাকে । পরে বিভিন্ন সময় দেশে সংখ্যালঘুদের জীবনটা যে খুব মসৃন নয় সেটা বুঝেছি পত্রিকায় বিভিন্ন খবর পড়ে, মুরুব্বিদের মুখে তাদের মালাউন গালি দিতে শুনে । বড়কালে ইউনিভার্সিটিতে জগন্নাথ হলের ক্যান্টিনে খাওয়া দাওয়ার পর সেখানে থাকা বন্ধুদের অনেককেই নানাবিধ অভিযোগ করতে শুনেছি । কিছু অসুবিধা তারা আমাদের সাথে শেয়ার করতো কিছু করতো না ।

তো, দেশের বাইরে যাবার প্রস্তুতি যখন নেই তখন জার্মানি নিয়ে দেশীয় বুদ্ধিজীবিদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, ভ্রমন কাহিনী ইত্যাদি পড়ে মোটাদাগে একটা ধারনা নিয়েছিলাম যে জার্মানি হলো কার্ল মার্ক্সের দেশ, ধর্মীয় গোড়ামি একদমই নেই এখানে । (এখন বিদেশ নিয়ে দেশীয় এসব লেখা হাস্যকর লাগে । ) এখানে বেশীরভাগ মানুষ কোন ধর্মে নিজেকে বেধে রাখতে চায় না । অধিকাংশ লোক এখানে কোন ধর্ম অবলম্বন করে না বলে ডিক্লেয়ার করে । এখানে এসে বুঝলাম প্রকৃতপক্ষে এরা এই কাজ করে ট্যাক্সের সুবিধা পেতে । বইয়ে পড়া সেইসব সাহিত্য থেকে পাওয়া ইওরোপের ছবি ভেঙে টুকরো হতে আমার খুব বেশীদিন লাগেনি । পা দেবার এক সপ্তাহের মধ্যেই নিজেকে এখানে একজন ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে আবিস্কার করে ফেলি ।

জার্মানিতে যারা থাকে তাদের সবাইকে স্টাডট অফিসে (সিটি কর্পোরেশন অফিস) আনমেল্ডুঙ (রেজিস্ট্রেশন বা তালিকাভুক্তকরণ) করতে হয় । যাতে করে সরকারি বেসরকারি সংস্থাগুলো একজন লোকের হদিস বের করতে পারে । দেশী বিদেশী সবার জন্যই এক নিয়ম । জার্মানিতে পা দেবার এক সপ্তাহ পরে গেলাম সেখানে আনমেল্ডুঙ করতে । গিয়ে দেখি একটা মোটামুটি বড় রুমে সারি দিয়ে টেবিল সাজানো । প্রতিটা টেবিলের সাথে অক্ষরের রেঞ্জ লেখা । ওর সাথে আমরা লাস্ট নেইম মিলিয়ে লাইনে দাড়াতে হবে । আমি দেখলাম পাশাপাশি দুটো টেবিলের একটাতে এইচ (ফার্স্ট নেইমের প্রথম অক্ষর) ও আরকটাতে এম (লাস্ট নেইমের প্রথম অক্ষর) । স্বাভাবিক কারনেই এম লাইনে দাড়িয়ে গেলাম । লাইন শেষে গিয়ে মিস্টি হাসি দিয়ে ডেস্কে বসা ফ্রাউ জানালো আমার পাশের লাইন অর্থাৎ এইচ লাইনে দাড়াতে হবে । কিছু না ভেবেই পাশের লাইনে গিয়ে দাড়ালাম । সেখানে ফ্রাউ একহার্ডট বেশ কিছুক্ষন আমার কাগজপত্র নিয়ে ঘাটাঘাটি করে একটা আনমেল্ডুঙের কাগজ হাতে ধরিয়ে দিলেন । একটু খেয়াল করতেই আমি দেখলাম সেই কাগজে আমার নাম,

Haseeb Mahmud, +

লেখা হয়েছে । আমি খুব বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করলাম এই প্লুসটা কিসের । জবাবে যা শুনলাম সেটা শোনার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না । ফ্রাউ একহার্ডট জানালেন আমি মুসলিম ও এই কারনে আমার ফার্স্ট নেইম নেই । আমি কিছুক্ষন তাকে বোঝালাম যে আমার ফার্স্ট নেইম হাসিব লাস্ট নেইম মাহমুদ । কে শোনে কার কথা । কিছুক্ষন তর্কের পর ফ্রাউ জার্মানদের অতিপ্রিয় ডায়লগ Das ist Deutschland বলে মামলা খতম ভঙ্গিতে তাকালেন । বুঝলাম যে এই মহিলার সাথে তর্কে গিয়ে লাভ নেই । হাজার হলেও জার্মানি থেকে বের করে দেবার ক্ষমতা এই মহিলার আছে । পরবর্তিতে ভিসা আপডেট বা অন্য যে কারনেই ফ্রাউ একহার্ডটের কাছে গিয়েছি সেবারই একই ভাবে একটা প্লুস যোগ করে আমার নাম লিখেছেন তিনি । * বিনা আকিকাতে নামের মধ্যে নতুন একটা প্লুস প্রাপ্তির মধ্য দিয়েই ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে গন্য হবার প্রথম অভিজ্ঞতা হয় আমার ।

pass

নাম লেখার এই নিয়মের কারনটা অনেক পরে জানতে পারি আমি । বাংলাদেশের পাসপোর্টে ফার্স্ট নেইম লাস্ট নেইম আলাদা করে লেখা থাকে না বলেই এই বিপত্তি । এই কারনটা না বলে কি কারনে আমার ধর্মের দিকে ফ্রাউ একহার্ডট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সেটা আমার কাছে এখনও পরিস্কার না । এখানে দ্বিতীয়/তৃতীয় শ্রেনীর কর্মচারিরা কিছু না জেনেই মানুষজনকে হরহামেশা নানারকম হাইকোর্ট সুপ্রিমকোর্ট দেখিয়ে থাকেন । তর্কে গেলে ফস করে বলে দেবে এইটা একটা নতুন রুল বা এই ধরনের কিছু একটা । একরম অসংখ্য অভিজ্ঞতা ঝুলিতে আছে । সময় সুযোগ মতো বলা যাবে সেগুলো ।

কন্টিনেন্টাল ইউরোপে সংখ্যালঘু হবার এটা ছাড়াও অনেক ধরনের জ্বালা যন্ত্রনা রয়েছে । দেশে থেকে এগুলোর খোজ খবর তেমন একটা না পেলেও এখানে একটু চোখ মেললেই দেখা যায় । বাংলাদেশে যেমন রমনা কালিমন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠা স্বাধীনতার পর প্রায় চার দশক পরেও সম্ভব হয় না তেমনি এখানেও সংখ্যালঘুদের প্রার্থনাগৃহ বানানো অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না । গ্রিসের এথেন্সে গত দুইদশক ধরে চেষ্টা চলছে একটি মসজিদ বানানোর । সেটা আজও সম্ভব হয়নি । সম্ভব না হওয়ার কারনগুলো শুনলে আক্কেল গুড়ুম হতে হয় । সিনেমায় দেখা ন্যুড বিচ খুল্লাম খাল্লা ইওরোপ বা সাহিত্যিকদের লেখায় উঠি আসা প্রগতিশীল ইওরোপের সাথে এগুলো যেন ঠিক মেলে না । এথেন্সের মেয়র যখন বলেন, এয়ারপোর্ট থেকে বিদেশীরা যদি মসজিদের মিনার দেখেন তাহলে তাদের খ্রিষ্টান দেশের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হবে তখন চোখটা কচলে দ্বিতীয়বার মেয়রের উক্তিটা পড়তে হয় । এথেন্সের মেয়র এটা নিয়ে বেশ একটা গণআন্দোলন টাইপও গড়ে তুলেছিলেন গত বছর । সরকারি ভাবে নীতিগত সিদ্ধান্ত, সৌদি বাদশাহের ফান্ডের নিশ্চয়তা এথেন্সে একটা মসজিদ বানানোর জন্য যথেষ্ট হয়নি । (সরকারি লোক ছাড়াও গণস্তরের প্রতিক্রিয়া দেখুন এখানে , পিলে চমকে যাবে নিশ্চিত ।

দেশে দেখিছি পদ্মার চর দখলের পর সেটাতে দখলিস্বত্ত্ব প্রকাশ করার জন্য দখলদার সেখানে ছাপড়া ঘর বানিয়ে তার কিছু লোককে সেখানে পাহারায় বসায় । এথেন্সেও এই মসজিদের জন্য প্রস্তাবিত জায়গাটা দখল করে সেখানে একটা চ্যাপেল বানিয়ে ফেলা হয়েছে । এখন সেখানে মসজিদ বানাতে সেই চ্যাপেল ভাঙতে হবে । দখলদারের চরিত্র মনে হয় সবজায়গাতেই এক।

এজাতীয় ধর্মিয় সংবেদনশীলতা দেখাতে জার্মানিও পিছিয়ে নেই । গত বছর এথেন্সের সাথে সাথে জার্মানির নর্থে এক ছোট শহরে কাদিয়ানিদের একটি মসজিদ বানানোর বিরুদ্ধে এরকম বাদ প্রতিবাদ হয়েছিলো । লিংক হারিয়ে ফেলেছি বলে শেয়ার করা গেলো না । পরে খুজে পেলে শেয়ার করবো । সেই ঘটনাটা বেশ ছোট আকারে ছিলো ও সেটা মিডিয়াতে তেমন আসেনি । সম্ভবত বিল্ড পত্রিকায় একটা ছোট নিউজ দেখেছিলাম ।

আর এবছর ক্যোলনে এরকম এক মসজিদ বানানো নিয়ে তুলকালাম হচ্ছে । এই তুলকালামে রাজনীতিবিদ, লেখক, বুদ্ধিজীবি সবাই হত্তে দিয়ে পড়েছেন । কে বলে শুধু গরিব দেশগুলোতেই ধর্ম নিয়ে গোড়ামী বেশী ! গরিবের বৌয়ের দুর্নাম সবসময় বেশীই হয়ে থাকে ।

ক্যোলনের এই মসজিদ বানানোর ঘটনায় সবার আগে যথারীতি চরম ডানপন্থি দলগুলো ঝামেলা পাকানো শুরু করেছে । ক্রিশ্চিয়ানিজম হাতছাড়া হবার জুজুর ভয়ে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়ামের কিছু ডানপন্থী দলও এই প্রসেসনে যোগ দিয়েছে । তাদের সাথে যোগ দিয়েছেন বিখ্যাত সাংবাদিক/লেখক রালফ গিওরডানো । মসজিদ বানানোর উদ্যোগকে তিনি “an expression of the creeping Islamization of our land.” বলে রায় দিয়েছেন । এতসবের পরও আশার কথা এই যে এই উদ্যোগে সিটি মেয়রের সমর্থন রয়েছে । ডানপন্থী সিডিইউ সরকারের মেয়র ইট্রেগরেশনের নামে একটু আধটু গাইগুই করলেও কোন আইনগত বাঁধা সৃষ্টি করেননি ।

মুসলিমদের প্রতি এই বিদ্বেষের কারনকে মিডিয়ার স্টেরিওটাইপকে দায়ি করেন অনেকে । আবার সম্পুর্ন ভিন্ন আচার আচরন ধারন করে বলেও এই দুরে ঠেলা প্রবনতার জন্ম হতে পারে । মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য জায়গায় সন্ত্রাসী প্রতিরোধও একটা কারন । এই মুসলিম ছাড়াও ইওরোপের আরেক ধর্মিয় সংখ্যালঘু ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর শত শত বছর অত্যাচার হয়েছে । তাদের সমূলে বিনাশ করার বেশ কয়েকবার চেষ্টা হয়েছে । যার শেষ প্রচেষ্টাটা করে এ্যাডল্ফ হিটল্যার । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সঙ্গিসাথীসহ সমূলে উৎপাটিত হলেও জার্মানদের মধ্য থেকে ইহুদি বিদ্বেষ একেবারে সরিয়ে ফেলা যায়নি । যার প্রমান সম্প্রতি এক জরীপে ধরা পড়েছে । সেখানে এক পঞ্চমাংশ জার্মান টিনএজার ইহুদিদের গড়পড়তা জার্মানদের মতো সমান সুযোগ সুবিধা দিতে দ্বিমত প্রকাশ করেছে । এই বিপুল সংখ্যক টিনএজারের শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে মানুষ বিচারের প্রবনতা জার্মান অভিভাবকদের কপালে আরেকটা ভাজ যোগ করবে বলেই মনে হয় ।

বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০০৭
সাইক্লোন সিডরের ক্ষয়ক্ষতির পরিপূর্ন অব্স্থা আস্তে আস্তে মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের কাছে পরিস্কার হচ্ছে । মৃতের সংখ্যা ৩০০০ ছাড়িয়েছে । সাধারণত সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা একটু কমিয়ে দেখানোটাই চল । মৃতের সংখ্যা কম হলে হয়তো সরকার বাহাদুরের কেরামতি বাড়ে । বেসরকারি রেড ক্রিসেন্ট ১০ হাজারের মতো একটা প্রাথমিক হিসাবে দিলেও সেটা নিয়ে পরবর্তিতে কোন আপডেট দিয়েছে বলে চোখে পড়লো না । বাকি এনজিওগুলো নানাধরনের স্পেকুলেশন দিলেও মানবসম্পদ ক্ষয়ক্ষতির কোন হিসাব এখনও দিতে পারেনি । তারা হয়তো ফসল খামারে তাদের লোনে করা সম্পদের ক্ষতির হিসাবে ব্যস্ত । এনজিওদের সংগঠন বা মাইক্রোক্রেডিটের কোন সংগঠন থেকে এখনও ঋণ বা সুদ মওকুফ অথবা নিদেনপক্ষে লোন রিসিডিউলিঙের কোন ঘোষণা দেয়নি ।

এই হতাহত গণনার সাথে সাথে দুর্গত এলাকাগুলোতে ত্রান দেবার কাজও শুরু হয়েছে । ত্রান কাজের ব্যবস্থাপনা শুরুতেই হোচট খেয়ে লেজে গোবরে অব্স্থায় পড়েছে । ভোটের কারনে হোক আর মানবতার কারনেই হোক স্বাভাবিক সময়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটা গুরুত্বপূর্ন রোল প্লে করে এসব দুর্যোগে । এবার সেটা পুরোপুরি অনুপস্থিত। বিএনপি তাদের ত্রান কার্যক্রম জরুরি অবস্থা তুলে নেবার দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে । আওয়ামী লীগ সাকুল্যে হাজার তিরিশেক টাকা যোগাড় করতে পেরেছে । দেশের মানুষ তাদের ভোট দিয়ে তাদের নেতানেত্রিদের ধনী হবার পথ সুগম করলেও জনগন তাদের নিজেদের দরকারের সময় বাকোয়াজি শুনতে পাওয়া ছাড়া আর কিছু পাচ্ছে না । আসলেই দুর্ভাগা আমার দেশ । এদের কারনের আজ ফৌজি প্লাটুন গণতন্ত্রের বুকে বুট খটখটিয়ে বেড়ায় ।

রবিবার ২৩ নভেম্বর ২০০৭
ভোখেনব্লাটের প্রথম অংশের ফোকাস ছিলো পাশ্চাত্যে ধর্মীয় গোড়ামির চেহারা । এবার আসি প্রাচ্যের ধর্মীয় গোড়ামির দিকে । এটা আরোও ভয়ংকর । তসলিমা ইস্যুতে উপমহাদেশীয় কীটগুলোর কর্মতৎপরতা সম্পর্কে পাঠকেরা এরইমধ্যে ওয়াকিবহাল । তসলিমা ইস্যুতে হেট মাথা উচু না করতে করতে সৌদি-সুদানিরা আবারও মাথা নীচু করে দিয়েছে সমগ্র মানবতার ।

প্রথম ঘটনা সৌদি আরবে । সৌদি আরবের ঘটনাটা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে । ওবামা-ক্লিনটনের ডিবেটেও এই ঘটনা উঠে এসেছে । ঘটনাটা এরকম, ১৯ বছর বয়সী এক মহিলা গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন সেখানে । সাতজনের এক দল এই অপকর্মের হোতা । অভিযোগ যথাসময়ে কোর্টে ওঠে । সৌদি আরবে চালু থাকা শরিয়া আইনে চলা নিম্নআদালত এই ধর্ষণের শিকার নারীকে ৯০ বেত্রাঘাতের শাস্তি প্রদান করে । সাথে উপরি হিসাবে জেল । কি তার অপরাধ ? আদালত সিদ্ধান্তে এসেছেন এই কুলটা নারী পরপুরুষের সাথে গাড়িতে চড়েছেন ও সেসময় তার পরনে উস্কানিমূলক (অথবা উত্তেজক) পোশাক পরা ছিলো । এথেকে তারা সিদ্ধান্তে এসেছেন যে এই নারীই দায়ী যাবতীয় ঘটনার জন্য ।

তো, ঘটনা এখানেই শেষ না । অল্প কিছুদিন পরে উচ্চ আদালতে আপিল হয় এই রায়ের বিরুদ্ধে । উচ্চ আদালত আরেক কাঠি সরেস । বিচারক মহোদয় শাস্তি যথেষ্ট মনে না করে সেটাকে ২০০ বেত্রাঘাত ও ৬ মাস জেলবাসে উন্নিত করেছেন । সেই সাথে ঘর্ষিতার পক্ষে যেই আইনজীবি লড়াই করেছেন তাঁর আইনজীবি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে ।
দ্বিতীয় ঘটনা সুদানে । ছোট বাচ্চাদের স্কুলে গিলিয়ানি গিবনস নামে এক শিক্ষিকা পড়াতেন । গত সেপ্টেম্বরে এক ক্লাসে তিনি বিভিন্ন প্রানী বিষয়ে পড়াচ্ছিলেন । সেখানে একটি টেডি বিয়ারকে দেখিয়ে শিক্ষিকা ছাত্রদের সেটার একটা নাম দিতে বলেন । ভোটাভুটির পর দেখা গেলো ছাত্ররা টেডি বিয়ারটিকে মুহাম্মদ নাম দিয়েছে । এই ঘটনাটা আস্তে আস্তে চাউর হয়ে গেলে সুদানে বেশ একটা গণআন্দোলন গড়ে ওঠে । আন্দোলনকারিদের দাবি এই শিক্ষিকা ছাত্রদের টেডি বিয়ারটিকে মুহম্মদ নাম দিতে বাধা না দেয়ায় তাদের মুহম্মদের অপমান হয়েছে । শিক্ষিকার উচিত ছিলো ছাত্রদের এ নামটি নির্বাচন না করতে দেয়া । এই অপরাধে আন্দোলনকারিদের চাপের মুখে সুদান সরকার গিলিয়ানি গিবনসকে ২দিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ১৫ দিনের কারাদন্ড দিয়েছে । ব্রিটিশ এই শিক্ষিকাকে ছাড়ানোর জন্য এখন বৃটিশ সরকার কুটনীতিক তৎপরতা চালাচ্ছে ।

ড. আইজউদ্দিন নামে ওপাড়ার এক ব্লগার একবার বলেছিলেন, ‘বাবা বলেছিলেন বড় হও, কিন্তু আজ আমি ছোট হই পদে পদে’ । অসহিষ্ণু ধর্মীয় কীটগুলোই বারবার আমাদের এই ছোট করে দেয় ।

টিকা
১. Anmeldung (আনমেল্ডুঙ) – রেজিস্ট্রেশন বা তালিকাভুক্তিকরণ
২. Frau (ফ্রাউ) – ইংরেজীতে Ms. । কোন মহিলাকে এখানে ফ্রাউ অমুক বা তমুক ডাকাটাই চল ।
৩. Plus (প্লুস) – ইংরেজীতে প্লাস ।
৪. Das ist Deutschland. (ডাস ইসট ডয়েশলান্ড) – ইংরেজী This is Deutschland. নিয়ম কানুনের ধব্জা দেখানোর জন্য জার্মানিতে এটা একটা প্রচলিত ঝাড়ি ।
৫. Koeln – ইংরেজীতে Kologne (কোলন), জার্মানির অন্যতম বিখ্যাত বড় শহর । উত্তরের রোম বলা হয় এ শহরটাকে ।
৬. জার্মান শহর মানহাইমে (Mannheim) মসজিদ বানানো দিয়ে একটি তর্ক পড়ুন । সব পড়া সম্ভব না হলেও কিছুটা পড়ুন । এটা পশ্চিম সম্পর্কে ধারনা বদলে দেবে আপনার ।
৭. সৌদে আরবের ধর্ষিতার জবানবন্দি পড়ুন এখানে

Text

ভোখেনব্লাট – ৪

বুধবার, ৭ নভেম্বর, ২০০৭

বাংলাদেশে যেমন বলিউড কালচার একটা নির্দিষ্ট জায়গা নিয়ে রেখেছে গণসংস্কৃতিতে । তেমনি ইউরোপে আমেরিকান সংস্কৃতির একটা প্রভাব দেখা যায় । বিশেষ করে উঠতি তরুনদের মধ্যে এই প্রবনতা খুব বেশী । বিরক্তিকররকমের নিরাপদ, একঘেয়ে জীবন তাদের হয়তো আর টানে না । এর থেকে হলিউডের গানফাইট কালচার, রেপারদের ঢিলেঢালা পোষাকআশাক তাদের খুব আকৃষ্ট করে । ইউরোপিয়ানরা তাদের ইউঙ্গেদের এই ঢিলেঢালা পোষাকে খুব বিরক্ত না হলেও গান কালচারে তাদের আকর্ষণ প্রায়ই মুরুব্বিকুলের চিন্তার কারন হয়ে দাড়ায় । আজ ফিনল্যান্ডে এক স্কুল ছাত্র স্কুলে গুলি চালিয়ে ৮জন ছাত্র শিক্ষককে হত্যা করেছে । বছর দুবছর পর পরই এরকম একেকটা হু্জ্জত লেগেই থাকে ইউরোপে । এদের প্রায় সবাই আমেরিকার কলাম্বিয়ার ঘটনা দিয়ে প্রভাবিত । এদের প্রায় সবাই মনে করে পৃথিবীটা কিছু লোকের কারনে বাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে । তাদের এই পৃথিবীটাকে বাসের যোগ্য করতে তারা এই আবর্জনাটাইপ লোকদের হত্যা করতে চায় ।
এই জাতিয় কোন খবর পেলেই কেমন যেন একটা আতংক পেয়ে বসে । তাড়াতাড়ি জানার চেষ্টা করি সেই গুলিবর্ষণকারি ছাত্র মুসলিম কিনা । সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মাবলম্বিদের কাজ হলে সেখানে এরা সোসাইটির খুঁত বের করতে আলোচনা করে । আর সংখ্যালঘিষ্টদের ক্ষেত্রে অবধারিতভাবে তারা আলকায়েদার সাথে দায়ি ব্যক্তির সম্পর্ক খোজার চেষ্টা করবে । সেই সাথে এমপি বুদ্ধিজীবি সবাই মিলে মুসলিম ইনফিলট্রেশন কিভাবে তাদের দেশকে লাটে ওঠাচ্ছে সেটা নিয়ে বিস্তর লাফঝাপ শুরু করবে ।
পত্রিকা খুজে দেখলাম ফিনল্যান্ডের সেই ছাত্র অমুসলিম । এটা আমার মনে এক ধরনের শান্তি দিলো এইকারনে যে এই স্কুলে গুরিবর্ষণকে কেন্দ্র করে আমাদের স্টাডট অফিসে নতুন কোন নিয়মের মুখে পড়তে হবে না, অথবা এটাকে কেন্দ্র করে নতুন কোন প্রশ্নপত্রও ফিল আপ করতে হবে না। আস্তিক নাস্তিক যাই হই না কেন ইউরোপ ভিন্ন ধর্মিদের জন্য খুব শান্তির জায়গা ছিলো না কোনকালে । এটা আস্তে আস্তে আরোও কঠিন যায়গা হয়ে যাচ্ছে ।

বৃহস্পতিবার, ৮ নভেম্বর ২০০৭
বাংলাদেশে ইন্টারনেটে টিকটিকি নজরদারি বৈধ করা হয়েছে । বোঝাই যায় প্রতিপক্ষকে নতুন নতুন কৌশলে ঘায়েল করার জন্য এটা একটা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হবে অচিরেই । বাংলাদেশ এই জাতীয় আইন তৈরীতে নতুন না । চায়নাতে এটা একটা বহুত ব্যবহৃত আইন । মানুষ কি করে সেটার খবর তো তারা নেয়ই, উল্টো সার্চ এঞ্জিনে ফিল্টার বসিয়ে মানুষ কি করবে কি দেখবে সেটাতেও তারা হাত দিয়েছে । চায়নার মতো বিশ্বমোড়ল ইউএসএতেও এই জাতীয় আইন রয়েছে । প্রতিবেশী দেশ ভারতে একবার ইয়াহু গ্রুপ ব্লক করা হয়েছিলো । এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও এরা এখনও ব্লগস্পটের মতো জনপ্রিয় সাইট ব্লক করে রেখেছে ।
এদের দেখাদেখিই হয়তো ইউরোপও এই টিকটিকি আইন চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে । আজকে জার্মান সরকারও এ আইনে সাড়া দিয়েছে । তারা এখন থেকে আমি কার কার সাথে টেলিফোনে কথা বলি, কাকে কাকে মেইল করি এসব ড্যাটা কালেক্ট করবে । এছাড়াও ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশনের সময় ডাক্তার, সাংবাদিকদের ওপরও তারা বিশেষ নজরদারি করতে পারবে । হায়রে সেলুকাস. . পুরো পৃথিবীটাই জেলখানা হয়ে গেলে যাবো কোনঠে বাহে ?

শনিবার, ১০ নভেম্বর, ২০০৭
আজ শহীদ নূর হোসেন দিবস । নূর হোসেনের হত্যার সময়টাতে আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি । নিতান্তই বালক বয়স । রাজনীতি বোঝার বয়স তখনো হয়নি । সেকারনে সেইসময়ের ঘটনা প্রবাহগুলো সেভাবে মনেও নেই । গুলি খাবার কিছু আগে নূর হোসেনের উদোম গায়ের বিদ্রোহী ছবিটা খুব আলোড়ন তুলেছিলো এটা মনে আছে । তো সেই থেকে নূর হোসেনের বাড়ির পাশের ঝিলে আশেপাশের নর্দমা থেকে অনেক বর্জ্য গিয়ে জমেছে । সেই সাথে আমাদের স্মৃতিতেও নূর হোসেনদের জন্য রেখে দেয়া জায়গাটাতে ধুলো জমেছে অনেক । রাজনীতিতেও তৎকালের স্বৈরাচারবিরোধী দলগুলো নূর হোসেনদের রক্ত মাংসে গড়া গণতন্ত্রের সিড়ি দিয়ে ক্ষমতার সিড়ি বেয়েছেন এক অথবা একাধিকবার । পুরনো স্বৈরাচারের সাথে এখন সময়ের বিবর্তনে হোক আর ক্ষমতার রাজনীতিতে হোক সেকালের লড়াকু দলগুলোর আর তেমন দাকুমড়ো সম্পর্ক নেই । সম্পর্কটা এখন অনেকটা আলু-তরকারির মতো । আলু যেমন কোন ঝামেলা ছাড়াই তরকারিতে মেশে । এখন আলু এরশাদ তেমনি বিএনপি আওয়ামীলীগ নামের চারপদ চৌদ্দপদের তরকারিগুলোতে কোন ঝামেলা ছাড়াই মিশতে পারেন ।
তো মাঝে মাঝে এই পুরনো লোকগুলোর জন্মমৃত্যুদিনগুলো আসে । ভুলে যেতে যেতে নামগুলো আবারো মনে পড়ে যায় । পুরনো পত্রিকা, বই এসব ঘেটে স্মৃতিটা ঝালাই করার চেষ্টা করি । আস্তে আস্তে বোধহয় সেই ঝালাইয়ের সুযোগগুলোও চলে যাবে । এবার নূর হোসেন বিষয়ক পত্রিকাগুলোর ট্রিটমেন্ট দেখে আমার অন্তত সেরকমই মনে হলো । কোথায় কে মিলাদ ও কোরান খতম দিচ্ছে, সে দোয়া মাহফিল করছে, কারা বিবৃতি দিয়েছে তাদের নাম, কারা মাজারে গিয়ে ফুল দিলো; এগুলোই ছোট একটি দায়সারা নিউজ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে সংবাদপত্র গুলো । ভেতরের পাতায় উপসম্পাদকীয়তেও কোন উল্লেখ করার মতো কিছু দেখলাম না যাতে আমরা জানতে পারি তখনকার ঘটনাপ্রবাহগুলো । আমরা জানতে পারি না কেন নূর হোসেনের আত্নত্যাগের ফল পেতে আমাদের আরো তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিলো । আরো দশ বছর পেরোতে না পেরোতেই দেখবো হয়তো পত্রিকাগুলো, সাথে কলামিস্টরাও তাদের ডিকশনারি থেকে নূর হোসেনদের বাদ দিয়ে দেবেন ।
সচলায়তনেই কেউ একজন (নামটা মনে করিয়ে দেবেন কেউ দয়া করে) একবার সাংবাদিক ফজলুল বারীর সাপ্তাহিক ২০০০এ প্রকাশিত একটি কলামের লিংক দিয়েছিলেন । সেখানে থেকে পাঠকদের জন্য কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি,
প্রিয় প্রজন্মের বিজ্ঞাপন দেখে সাংবাদিক হতে এসেছেন পলব মোহাইমেন। জামালপুরের একটি কলেজ শিক্ষকের ছেলে। পড়াশুনা উপলক্ষে তখন ঢাকায় বিএনপি নেতা ড. আর এ গণি’র বাসায় থাকতেন। পলবকে যাচাই করতে সে শিল্পীকে খুঁজে বের করে ইন্টারভ্যু’র এ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হয়। দু’দিনের মধ্যে সে শিল্পীকে খুঁজে বের করে ইন্টারভ্যুটি লিখে এনেছেন যুবক। সঙ্গে স্বাক্ষী হিসাবে শিল্পীকেও অফিসে নিয়ে এসেছেন। নূর হোসেনের বুকে নিপাত বানানটি ভুল বানানে ‘নীপাত’ লেখা ছিল। শিল্পীকে সেটি জিজ্ঞেস করলে সত্য স্বীকার করেন অকপটে। তার দাবিটি ছিল বানানটি নূর হোসেনই ভুল লিখেছিলেন। পুরনো ঢাকায় তার সাইনবোর্ড লেখার ব্যবসা। সেই সকালে নূর হোসেন তার কাছে এসে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নীপাত যাক’ শোগান দুটি দেয়ালে লিখে সেটি তার বুকে পিঠে লিখে দিতে অনুরোধ করেন। নূর হোসেন যেভাবে বানানগুলো লিখেছেন তিনিও সেভাবে তা লিখে দিয়েছেন তার বুকে পিঠে।
আসল কথা হলো বানান ভুল না শুদ্ধ উত্তাল সেই সময়ে সেটি কারও দেখার বা বিবেচ্য ছিল না। সেভাবে একটি জীবন পোষ্টার হয়ে স্বৈরাচারের বেদীমূলে প্রাণ দিয়েছেন নূর হোসেন। তার সেই আত্মত্যাগ এরশাদের গদিতে যে ধাক্কা দিয়েছে সেটি আর কখনো সামাল দেয়া যায়নি। বাংলাদেশ আর বাংলা সাহিত্যের সমকালীন সময়ের শ্রেষ্ট কবি শামসুর রাহমানও তখন নূর হোসেনকে নিয়ে তার অন্যতম শ্রেষ্ট কবিতাটি লিখেছেন। ‘রোদের অক্ষরে লেখা নাম।’ গুলিবিদ্ধ নূর হোসেনকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে ধরে রিকশায় তুলেছিলেন খিলগাঁও’তিলপাপাড়ার ক্লাস এইটের ছাত্র সুমন। বিচিন্তায় তখন আমরা সুমনের ইন্টারভ্যু করে নূর হোসেনের শেষ কথাগুলো লিখেছি। গোরান গোরস্তান ঘুরে এসে নূর হোসেনের কবর নিয়েও প্রথম রিপোর্টটি ছাপা হয়েছে বিচিন্তায় । প্রিয় প্রজন্মেও প্রথম ছাপা হয়েছে নূর হোসেনের শিল্পীর সাক্ষাৎকার। সেই পলব এখন প্রথম আলোর আইটি বিষয়ক জনপ্রিয় রিপোর্টার।
আরেকটি সত্য লেখা দরকার। ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখা নূর হোসেনের পিঠের ছবিটির জন্যে তখন খ্যাতিমান হয়েছেন আলোক চিত্রশিল্পী পাভেল রহমান। ইত্তেফাকে তখন তার ছবিটি ছাপা হয়েছিল। এরপর নূর হোসেনের বুকের ‘স্বৈরাচার নীপাত যাক’ লেখা ছবিটি নিয়ে স্বারক ডাক টিকেট প্রকাশের সময়ও বলা হয়েছিল ছবিটি পাভেল রহমানের তোলা। কিন্তু আমরা রাজপথের সাংবাদিকরা জানি ছবিটি তুলেছেন সৌখিন আলোক চিত্রশিল্পী দিনু আলম। ঈশ্বরদীর ছেলে দিনু আলম এখন কানাডা প্রবাসী।

কৃতজ্ঞতা, ফজলুল বারী ও যিনি এটি সচলায়তনে শেয়ার করেছেন তাদের প্রতি । আন্দোলনের সেই দিনে নূর হোসেন কি করছিলেন কোথা থেকে তাঁর গায়ে কথাগুলো লিখিয়েছিলেন সে বিষয়ে আরোও বিস্তারিত জানালে আরোও উপকৃত হতাম আমরা । কানাডা প্রবাসী সচলদের কাছে অনুরোধ থাকলো এই দিনু আলমকে খুঁজে বের করার । ইন্টারনেট বা অন্য কোথাও নূর হোসেনের ছবিটার কোন ভালো কোয়ালিটির ছবি পাওয়া গেলো না । দিনু আলমই এটা দিতে পারেন হয়তো ।
আজকে যতদুর দেখলাম ভোরের কাগজ নূর হোসেন বিষয়ে সর্ববৃহৎ কভারেজ দিয়েছে । ড. মোহাম্মদ নূর উদ্দিন লিখিত কলামটি পড়ে একটা তথ্যের অমিল পেলাম ফজলুল বারীর সাথে । ফজলুল বারী বলছেন নূর হোসেনের কবর গোরান গোরস্থানে । কিন্তু ড.নূরউদ্দিন বলছেন সেটা জুরাইনে । কোনটা সঠিক ? ২০বছরেও যদি এরকম বেসিক তথ্যে গড়বড় হয় আরো কয়েক দশক পর কি হবে সেটা চিন্তা করতেই ভয় হয় ।

রবিবার ১১ নভেম্বর ২০০৭
আজ সবাই মিলে স্টুটগার্ট গেলাম । পাশের প্রদেশের রাজধানী স্টুটগার্ট । হোম অফ ম্যারসেডেস, পোরশে, বোশ । এই শহরের কোট অফ আর্মসটা পোরশের লোগোর মাঝখানে সাঁটা আছে । শুধু গাড়ি বানানোই এই শহরের কৃতিত্ব নয়, দার্শনিক হেগেল, কবি শিলারের জন্মও এই শহরে । শহরটা একটা পাহাড়ে শহর । এর মানে হলো, শহরটা ঘুরতে যেতে ভালো, কিন্তু থাকতে ততটা ভালো না । উলমের সীমানায় পাহাড়ের ওপর শহর থেকে ৩০০ ফুট ওপরে থাকতে হয়েছে এক বছর । আমি বিলকুল জানি দৈনিক পাহাড় ঠ্যাঙ্গানো বাঙ্গালি পায়ের কম্মো না ।
তো এই স্টুটগার্টে যাওয়া উপলক্ষে জার্মানির ট্রান্সপোর্টেশন নিয়ে কিছু বলি । গরিবী ট্রাভেলারদের জন্য ইওরোপে জার্মানি সবচেয়ে ভালো যায়গা । এখানে গ্রুপ টিকেট নামে একটা কনসেপ্ট প্রচলিত আছে । একটা গ্রুপ টিকেট পাওয়া যায় যেটা দিয়ে যেকোন একটি স্টেটে সারাদিন প্রায় সবধরনের ট্রান্সপোর্টে চড়া যায় । দাম মাত্র ২৭ ইউরো । ৫ জনের গ্রুপ হলে মাথাপিছু ৫ ইউরোর একটু বেশী । একলা হলে মাথাপিছু খরচটা বেড়ে ১৯ ইউরোতে দাড়ায়। তো এরকমই একটা গ্রুপ টিকেট উইকেন্ডে পাওয়া যায় যেটা আরো কয়েক ইউরো বেশি । পার্থক্য হলো এটা দিয়ে এক দিনে নির্দিষ্ট স্টেটের সারা জার্মানির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত যাওয়া যায় । দাম সস্তা হলেও জার্মানির ট্রেন সার্ভিস নিয়ে অভিযোগ করার সুযোগ কম । সময়মতোই স্টেশনে এসে থামে সময়মতোই ছাড়ে এখানকার ট্রেন ।

টিকা: ইউঙ্গে – ইংরেজী ইয়াং ।

Text

ভোখেনব্লাট – ৩

৩০শে অক্টোবর, ২০০৭

আমি যেখানে কাজ করি সেখানে আমাকে বড় একটা হলরুমের মতো জায়গায় কাজ করতে হয় । পাঁচজন বসের তত্ত্বাবধানে আমরা সাত জন স্টুডেন্ট ওয়ার্কার কাজ করি সেই রুমে । আজ সকালে এসেই দেখলাম সব জার্মান বসেরা একত্রে বসে উত্তেজিত ফিসফাস করছে । প্রমাদ গুনলাম মনে মনে । মনে করার চেষ্টা করলাম গত সপ্তায় গাধার মতোন কোন কাজ করেছি কিনা । হয়তো সেটাই তাদের গজগজ ফিসফিসের কারন । আস্তে আস্তে নিজের জায়গায় বসে গত সপ্তাহের কাজগুলোয় নজর বোলালাম । নাহ সবতো ঠিকই আছে মনে হচ্ছে । তো, ততক্ষণে বসরা ফিসফিস শেষ করে নিজের জায়গায় গিয়ে বসেছে । আস্তে করে নিটকতম বসকে জিজ্ঞেস করলাম [i]আলেস ক্লার[/i] কিনা । জবাবে বসের কাছে যেটা শুনলাম সেটাতে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম । ঘটনা আউটোবানে স্পিড কন্ট্রোল নিয়ে । যেহেতু আমার গাড়ি নাই সেহেতু আউটোবনে স্পিড লিমিট আমার বিষয় আশয়ের বাইরের টপিক ।
autobahn_1029
ঘটনা যেটা শুনলাম সেটা হলো জার্মানির দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এসপিডি জার্মান হাইওয়েতে স্পিড লিমিট দেবার জন্য একটি প্রস্তাব রেডি করেছে । এসপিডি সরকারি দল সিডিইউয়ের সাথে ক্ষমতায় অংশীদার । তারা তাদের প্রস্তাবের পক্ষে কার্বন ডাই অক্সাইড উদগীরনকে প্রধান যুক্তি হিসেবে দাড় করিয়েছেন । নতুন প্রস্তাব মতে আউটোবানের যেসব জায়গায় স্পিড লিমিট নেই সেখানে সর্বোচ্চ গতিসীমা ১৩০ কিলোমিটার বেঁধে দেবার কথা । স্বভাবতই বেশীরভাগ ডয়েশে মানই এই প্রস্তাবে বিরক্ত । কারনটাও পরিস্কার । পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো গাড়ি বানিয়ে সেই গাড়ী যদি তারা টেস্টই না করতে পারলো তাহলে এই গাড়ী ইন্ডাস্ট্রি ইম্প্রুভড গাড়ী বানানোর উৎসাহ পাবে কোথায় !

জার্মানির এই আউটোবান সারা পৃথিবীদের স্পিডফৃকদের স্বপ্নের ট্র্যাক । ১২০০০ কিলোমিটারের এই আউটোবানের অর্ধেক জায়গায় কোন স্পিড লিমিট নেই । আবার যেসব জায়গায় আছে সেখানেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্পিডে লিমিট বাঁধা । বাকি সময়টাতে যেমন ইচ্ছা তেমন চালাও । আমাদের মধ্যে এরকম একটা প্রচলিত ধারনা আছে যে স্পিড লিমিট থাকলেই দূর্ঘটনা কম হবে । স্টাটিসটিকস এই ধারনাকে সমর্থন করে না । জার্মানিতে বেশিরভাগ সড়কদূর্ঘটনায় মৃত্যু স্পিড লিমিট বেধে দেয়া রাস্তাগুলোতে হয় । আবার অন্য দেশগুলো যেখানে স্পিড লিমিট দেয়া থাকে সেখানকার তুলনায় স্পিড লিমিটবিহীন জার্মানি বেশ ভালো একটি অবস্থান ধরে রেখেছে ।

১লা নভেম্বর, ২০০৭

আমার বাসার পাশের শপিং কম্প্লেক্সের কাছে ফুটপাতে একটা দোকান আবিস্কার করেছি সম্প্রতি । রাতে খাবার পর হাটতে বের হলে আমি প্রায়ই ওটা দেখে আসি । দেখতে আমাদের দেশের ফুটপাতের দোকানের মতোই । গাজীপুরে যাবার সময় রাস্তার ধারে দোকানিরা যেমন কাঠাল তরমুজ রাস্তার ওপর ফেলে দোকান সাজিয়ে বসে সেরকম বন্দোবস্ত । দেশি দোকানের সাথে পার্থক্যটা হলো এই দোকানে কোন দোকানি নেই । কুমড়া, ভুট্টা, আরোও কিছু সব্জি আনাজ সাজানো থাকে । আর সামনে থাকে বাংলাদেশে মসজিদ মাজারে দেখতে পাওয়া দানবাক্সের মতো ছোট একটা [i]কাসে[/i] বাক্স । সেখানে যার যার খুশি মতো দাম দিয়ে গেলেই হবে । না গেলেও হয় । দেখার জন্য কেউ নেই । আশে পাশে সারভেইল্যান্স ক্যামেরা থাকলে এখানে সাধারনত সেটার কথা ছোট একটা সাইনে লেখা থাকে । সেটাও নেই । আমি একদিন বেশ কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে খেয়াল করেছি সবাই এসে কাসে বাক্সে পয়সা ফেলে জিনিস পত্র কিনে নিয়ে যাচ্ছে । কেউ ধারে কাছে না থাকলেও নিয়ম করে সবাই দাম দিয়ে যাচ্ছে ।
আজকে ভাবছিলাম গড়পড়তা জার্মানরা যে এরকম সৎ জীবনযাপন করে এর কারন হিসেবে কোন জিনিসটা কাজ করে । অসৎ হবার একটা কারন হতে পারে আর্থিক দুরবস্থার অথবা অনিশ্চয়তা । দুই জার্মান একত্র হবার পর থেকে জার্মান ইকোনমি সমান তালে নিচের দিকে নামলেও এদের ক্রাইম স্টাটিসটিকস সেটা বলে না । ইউনিফেকেশন পরবর্তি ক্রাইমের ট্রেন্ডটা মোটামুটি অবাক করা ফ্ল্যাট ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রফেসর ড. মোজাফফর আহমেদকে একদিন বাংলাদেশে দুর্নীতি মাস লেভেলে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টা নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম । তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, মাত্র ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ চ্যাপ্টার শুরু হয়েছে । দুর্নীতিতে আমরা সেবারই প্রথমবারের মতো প্রথম । স্যারের বক্তব্য ছিলো একটা সোসাইটির মানুষ যখন নিজের সামর্থের অতিরিক্তি কনসাম্পশন করতে থাকে তখনি সেখানে দুর্নীতি আসতে বাধ্য । জার্মান সোসাইটি আমি বাইরে থেকে যতদুর দেখি তাতে বুঝি যে এই অতিরিক্ত কনসাম্পশন তাদের ধাঁতের বাইরে । পুরো দেশটাই একটা অনাড়ম্বর ঘরোয়া পরিবেশ তারা তৈরী করেছে দিনের পর দিন ধরে । হঠাৎ করে ঘুরতে আসা দেশী টুরিস্টদের আমি এখানে এসে হাহুতাশ বলতে শুনেছি কি একটা দেশ একটা উচু বিল্ডিং নেই । এর থেকে নাকি নিউইয়র্ক অনেক উন্নত ! এখানে একটি গড়পড়তা বাড়ির বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই বাড়ির মালিকের আর্থিক অবস্থা কিরকম । ব্যাংকে ধুন্দুমার ব্যালান্স থাকলেও আমার সুপারভাইজরকে দেখি একটা পুরনো সাইকেল নিয়ে তিনশত ফুট উচু পাহাড় বেয়ে প্রতিদিন অফিসে আসতে । জিজ্ঞেস করলে বলে সে এটা হেলদি প্রাকটিস হিসেবেই করে ।
উল্টো দিকে আমার দেশে কিছু একটা করে সেটা সবাইকে দেখিয়ে দিতে পারাটাই যেন জীবনের চুড়ান্ত লক্ষ্য । বিয়ে, জন্মদিন, বাড়ি সাজানোতে আমরা যে টাকা ব্যয় করি সে অনুপাতে বলতে হয় জার্মানরা দরিদ্র জীবন যাপনই করে ।

২রা নভেম্বর, ২০০৭

ঢাবিতে একসময় কোন ছাত্র নারী ছাত্রদের সাথে কথা বলতে দেখা গেলে জরিমানা গুনতে হতো । আইনটা শুনতে পাই এখনও জারি আছে । প্রয়োগ হয়না এই যা । তো এরকম এক আজব নিয়মের কথা জানতে পারলাম আজকে । চবিতে কর্তৃপক্ষ পড়াশোনার সাথে কোন ধরনের চাকরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন । সেখানে বিশেষ করে ‘সাংবাদিকতা’ পেশার কথা উল্লেখ করা হয়েছে । ছাত্ররা নাকি সইসাবুদ করে চবিতে এই শর্তে ভর্তি হয়েছেন যে তারা পড়াশোনার বাইরে কোন পেশায় জড়াবেন না ! এই আদেশের প্রজ্ঞাপন জারি করে তারা নাকি সেটার একটা কপি ইউজিসিতে পাঠিয়েছেন । বলিহারি যাই, ছাত্ররা পড়াশোনার সাথে কি করবে না সেটাও ঠিক করবে ইউজিসি ! ফৌজি শাসিত দেশটা কি ক্যাডেট কলেজে রূপ নিলো শেষে !
আপডেট – রবিবারের পত্রিকা বলছে এটা শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সার্কুলার ।

৩রা নভেম্বর, ২০০৭

আমাদের দেশে সব সরকার মহাশয়ই ক্ষমতায় গিয়ে যে কাজটি করেন সেটা হলো শিশুদের স্বাধীনতার ইতিহাস সঠিকভাবে জানানোর জন্য পাঠ্যপুস্তক সংস্কার । রেগুলার সরকারের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারও সম্প্রতি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন । তবে এবারের এই পদক্ষেপটা কি ফল বয়ে নিয়ে আসে সেটাই প্রশ্ন । দুটো প্রধান রাজনৈতিক দল একবার শেখ মুজিব আরেকবার জিয়াউর রহমানকে পাঠ্যপুস্তক থেকে সরিয়ে ফেলার কাজেই ব্যস্ত ছিলো । হালের ফ্যাশন অনুযায়ী এখন রাজাকার আলবদরদের অপকর্মগুলো হয়তো মুছে ফেলা হবে । ‘দেশে যুদ্ধপরাধী নেই’, ‘দেশে যুদ্ধাপরাধী আছে কিনা মনে করতে পারছি না’ ইত্যাকার নানা সংলাপে আকাশ বাতাস মুখরিত এখন ।
জার্মান দেশে গণহত্যা হয়নি বললে জেলে যেতে হয় । ইওরোপের অন্যান্য অনেক দেশেও এটাই আইন হিসেবে বলবৎ আছে । দুষ্ট লোকেরা মাঝে মাঝে বলে আমরা নাকি পশ্চিমাদের কাছ থেকে খারাপগুলোই শিখি । তো, এই স্বাধীনতার ইতিহাস প্রসঙ্গে মনে হয় আমাদের সরকারপুঙ্গব বাকস্বাধীনতার মতো ভালো জিনিসটাই শিখে সেটা প্রাকটিস করছেন । তবে সেটা শুধুমাত্র স্বাধীনতা বিরোধীদের জন্য সংরক্ষিত । কোনরকম ভয় ভীতি ছাড়াই যত্রতত্র তারা যা খুশি তাই বলে বাকস্বাধীনতার চরম ব্যবহার করছেন ।
আমাদের সময় আজ আরেক সুশীল তত্ত্বাবধায়ক বিচারপতি হাবিবুর রহমানের একটি কলাম ছাপিয়েছে । এটা গত বছরে প্রথম আলোর স্বাধীনতা দিবস সংখ্যায় প্রকাশ পেয়েছিলো । সেখানে তিনি ইতিহাসের নানারকম ভার্সনে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে ‘সুকুমার কোমলমতি ছাত্রদের পক্ষে তার (ইতিহাসের) মোদ্দা কথা বুঝতে’ যেন কষ্ট না হয় সেজন্য বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের একটি ভার্সন দাড় করিয়ে দিয়েছেন । সেটা নিয়ে আগামী পনের বছর কোন প্রকার কথা বার্তা না বলতেও তিনি নসিহত করেছেন । ইতিহাসের সেই ভার্সন থেকে আমরা জানতে পারি ‘২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তান সৈন্যবাহিনী ঢাকায় এক পিটুনি অভিযান চালালে বহু লোক নিহত হয়’। হান্নান মুজাহিদ গঙ তাহলে তো নতুন কিছু বলেনি ! গণহত্যা আর পিটুনি অভিযান নিশ্চয়ই এক জিনিস নয় ! আর সামান্য পিটুনির জন্য কাউকে নিশ্চয়ই যুদ্ধাপরাধী বলা যায় না !
দুঃখ হয় দেশটার জন্য । হান্নান মুজাহিদ গো. আজমরা নাহয় নিজেদের প্রান বাঁচাতে এইসব বকাবাহ্যি করে বেড়ায় । কিন্তু সুশীলকুলশিরোমনিদের একজন এই হাবিবুর কিসের এজেন্ডার বাস্তবায়নে এইসব প্রচার করেন ? আর প্রথম আলোই বা কি এজেন্ডা মাথায় রেখে এগুলো প্রচার করে কোনরকম প্রতিবাদ ছাড়াই ? তাও এমন একটা দিনে যেদিন কালোরাতের স্মৃতি প্রতিটি বাঙ্গালিকে কামড়ে বেড়ায় ?

টিকা
১. আলেস ক্লার – আলেস মানে ইংরেজী অল, ক্লার মানে ইংরেজী ক্লিয়ার । সবকিছু ঠিক আছে কিনা জানতে এই বাক্যটাই ব্যবহার করার চল ।
২. আউটোবান (Autobahn) – জার্মান হাইওয়ে ।
৩. ডয়েশে মান – জার্মানির নাগরিক
৪. গেরহার্ড শ্রোয়েডারের পার্টির নাম এসপিডি । শ্রোয়েডারের দল গত মেয়াদে জার্মানিতে ক্ষমতায় ছিলো । এখন সিডিইউয়ের সাথে ক্ষমতায় শরীক দল ।
৫. কাসে – ইংরেজী ক্যাশ

Text

ভোখেনব্লাট – ১

মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০০৭

উলমের বাসগুলোতে নতুন একটা ফিচার যোগ হয়েছে । এখানকার বাসগুলোতে আগে থেকেই সামনে ও পেছনে স্কৃনে দু’টো করে মোট চারটা এলসিডি স্কৃন লাগানো আছে । বাসেরই কোথাও একটা কম্পিউটার থেকে ওগুলোর ছবি আসে । প্রথম যখন এগুলো লাগানো হয় তখন বাদিকে স্কৃনে স্টপেজের নামগুলো আসতো । আর ডানদিকেরটাতে কোন না কোন বিজ্ঞাপন দেখাতো । সম্প্রতি এই বিজ্ঞাপনের সাথে যোগ হয়েছে নিউজ হেডলাইন দেখানো । জনপ্রিয় একটি জার্মান চ্যানেলের খবরের হেডলাইনগুলো দেখানো হয় সেখানে । আইডিয়া উদ্যোগ যেটাই বলি না কেন সেটা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ ।

আজ অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে ওটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম । ওখানে প্রথম হেডলাইনটা ছিলো জার্মান লেখক গুয়েন্টার গ্রাসের আশিতম জন্মদিন নিয়ে । গুয়েন্টার গ্রাসের লেখক জীবন নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই । বিশ্বসাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ন স্তম্ভ তিনি । সাহিত্য ছাড়াও জার্মান বাম রাজনীতিতে তিনি যুক্ত । পঞ্চাশের দশকে তার বিখ্যাত উপন্যাস টিন ড্রাম প্রকাশের কিছুদিন পরেই প্রকাশ্য উইলি ব্রান্ডট্-এর এসপিডির (সোশাল ডেমোক্র্যাটদের) সমর্থনে কাজ করতে থাকেন । সেই থেকে গুন্টার গ্রাস জার্মান বাম রাজনীতির একজন ব্রান্ড এ্যাম্বেসেডর ।

শুভ জন্মদিন প্রিয় লেখক গুয়েন্টার গ্রাস ।

জার্মানীতে গত বছর প্রকাশিত হয়েছে গুয়েন্টার গ্রাসের আত্মজীবনি । অগাস্ট মাসে সেটা বের হয় । আমার তিন বছরের জার্মানবাসে হ্যারি পটারের পর এটারেই সবচেয়ে সাড়াজাগানো বই চিহ্নিত করবো । এই সাড়া জাগানোর আরেকটা কারনও ছিলো । বই প্রকাশের কিছুদিন আগে গ্রাস এক সাক্ষাতকারে তার জীবনের এক কালো অধ্যায়ের কথা স্বীকার করেন । তিনি এই স্বীকারোক্তিতে তাঁর আত্মজীবনিতে লিখেছেন বলে সাক্ষাতকারে জানান । সেখানে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভাফেন এসএস (Waffen SS)এর ট্যাংকবাহিনীর গানার ছিলেন । গ্রাসের এই স্বীকারোক্তি জার্মানীসহ পুরো বিশ্বের মুক্তবুদ্ধির চিন্তাভাবনায় একটা ধাক্কার মতো ছিলো । গভীর দুঃখবোধে আমিও আক্রান্ত হই । বিশ্বাসের জায়গাগুলো নড়বড়ে হয়ে গেলে বাকি সবার যেমন হয় । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এধরনের স্বীকারক্তি বা হঠাৎ করে কারো পুরনো ইতিহাস প্রকাশ হয়ে পড়া একেবারে নতুন ঘটনা না । তবে গ্রাসের ব্যাপারটা ভিন্ন ছিলো । গুয়েন্টার গ্রাস এতোশত দার্শনিকের জন্ম দেয়া জার্মানীর “মোরাল অথরিটি বা মোরাল ইনস্টিটিউশন বলা হতো । এরকম একজন ব্যক্তির দীর্ঘ ষাট বছর নিজের এই কলঙ্কিত ইতিহাস লুকিয়ে বেড়ানোটা কেউই সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি ।

Günter Grass

সবার মধ্যেই কিছু অমিমাংসিত প্রশ্ন থাকে । এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের সারাজীবনই বিক্ষিপ্ত করতে থাকে । আমার মনেও এরকম একটা অমিমাংসিত প্রশ্ন আছে । প্রশ্নটা হলো একজন ব্যক্তিমানসকে আমরা আসলে কিভাবে বিচার করবো ? ব্যক্তির পুরো জীবনটা এ্যাজ-এ-হোল নাকি তার জীবনের প্রতিটি অর্জন ব্যর্থতা আলাদা আলাদাভাবে বিচার্য্য ? এর একটা সহজ সমাধান আমরা করি । ভালো মন্দের একটা তুলনা করে সেটার ভিত্তিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি একজন ব্যক্তি সম্পর্কে । সমাধানটার খুব শক্ত যৌক্তিক ভিত্তি নেই । কারন এই ধরনের দাড়িপাল্লা পদ্ধতিতে ওজনের কোন নির্দিষ্ট মানদন্ড নেই । সোজা কথায় ব্যক্তির এক একক খারাপ কাজ ইক্যুয়াল টু কত একক খারাপ কাজ এটা নির্ধারণ করার সর্বগ্রাহ্য কোন মানদন্ড নেই । একেকজন একেকভাবে বিষয়টা দেখবে । কেউ হয়তো আইনস্টাইনের সারাজীবনের বৈজ্ঞানিক অবদানকে তাঁর লেখা চারটি চিঠির থেকে বড় করে দেখবে । আবার কেউ হয়তো সে চারটি চিঠির জন্যই আইনস্টাইনকে তুলোধুনো করবে । গুয়েন্টার গ্রাসের স্বীকারোক্তিও আমাকে এই একই প্রশ্নের মুখোমুখি করেছিলো । গুয়েন্টার গ্রাসের সারাজীবনের ইন্টেলেকচুয়াল লিডারশিপ বড় নাকি তার কৈশোরত্তীর্ন বয়সের অপরাধ বড় ?

লিংক

বুধবার, ১৭ অক্টোবর ২০০৭

আজকে বিডিনিউজ২৪-এ একটা ছোট হেডিঙে চোখ আটকালো । ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রি মহমোহন সিং বুশকে ভারত-আমেরিকা নিউক্লিয়ার ডিল বিষয়ে অভ্যন্তরীন চাপ সম্পর্কে অবহিত করেছেন । এই অভ্যন্তরিন চাপটা এসেছে মূলতঃ ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের অংশিদার পশ্চিমবঙ্গ বাম ফ্রন্টের কাছ থেকে । নন্দিগ্রাম ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গ বাম সরকারের ভূমিকায় ঠিক স্বস্তি পাচ্ছিলাম না । এর মধ্যে এই ছোট্ট খবরটা একটু আরাম দিলো ।

আমাদের দেশেও একশ্রেনীর বিজ্ঞানী আমলা রাজনীতিকরা দেশে নিউক্লিয়ার পাওয়ারপ্লান্ট বসানোর তোড়জোড় শুরু করেছেন । দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানী চাহিদা মেটানোর জন্য এটাই নাকি একমাত্র বুদ্ধি । এই নিউক্লিয়ার প্লান্ট বসানোর জন্য আনবিক শক্তি বিষয়ক আন্তর্জাতিক মোড়ল সংস্থার অনুমতিও পাওয়া গেছে । এবং এটার খরচের ৬০ ভাগ সরবরাহের জন্য দক্ষিন কোরিয়ার কাছ থেকে সম্মতিও নাকি পাওয়া গেছে । ২০১৫ সালের মধ্যে এই প্রজেক্ট কাজ শুরু করতে পারবে খবরে বলে জানলাম ।

এই ধরনের প্রজেক্টের নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে । প্রথম সমস্যা স্বাস্থ্যগত । পৃথিবীতে এধরনের পাওয়ার প্লান্টের আশেপাশের এলাকায় অনেক ধরনের ব্যাখ্যাতিত (অথবা ব্যাখ্যাগুলো চেপে যাওয়া হয়) স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা যায় । দ্বিতীয় সমস্যা পারমানবিক বর্জ্য নিস্কাশন । এধরনের বর্জ্য দীর্ঘকাল ধরে তেজস্ক্রিয়তা নির্গমন করে । এটার কোন দিকনির্দেশনা বিশেষজ্ঞমহল বা আমলামহল কারো কাছ থেকেই এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি । তৃতীয়ত, এধরনের নিউক্লিয়ার প্রজেক্টের অন্য সব ধরনের প্রজেক্টের মতোই একটা ওয়োর্স্ট পসিবল ডাউনসাইড পটেনশিয়াল থাকে । সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান ইউক্রেন) চেরনোবিল দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা এরকম একটা ডাউনসাইড পটেনশিয়াল দেখেছি । এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সেটার ক্ষয়ক্ষতি কতোটা মিনিমাইজ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে সেটার বিষয়ে নীতিনির্ধারক মহল কি চিন্তা করেছেন সেটা জানার আগ্রহ বোধ করি ।

জার্মানীর বামপন্থি গেরহার্ড শ্রোয়েডারের সরকার নিউক্লিয়ার পাওয়ারপ্লান্টের এসব নেতিবাচক দিক লক্ষ্য করে ২০২০ সালের মধ্যে জার্মানীর সকল নিউক্লিয়ার পাওয়ার জেনারেটর বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো । ডানপন্থি আঙ্গেলা মারকেল সরকারও সেটা স্পস্ট ভাষায় বহাল রাখার সিদ্ধান্ত জারি রেখেছে । রাশিয়ান পাওয়ার সাপ্লায়ারদের খামখেয়ালির মধ্যে তাদের এ সিদ্ধান্ত বেশ সাহসিকতার । অল্টারনেটিভ এনার্জির প্রযুক্তির জোরই হয়তো তাদের এই সাহসের কারন ।

আমাদের দেশের এরকম সাহস নেই । দেশের অনেকটা অংশেই কোন বিদ্যুৎ নেই । যেসব জায়গায় আছে সেখানের জনগন লোডশেডিঙে অতিস্ঠ । প্রায়ই আন্দোলন-ফান্দোলন করে প্রান খোয়াতে হয় আমাদের । বুকে একগাদা স্বপ্ন নিয়ে বাস করি বলে আমাদের অভাগা দেশটা সবসময় শর্টকাট খোঁজে । শর্টকাট কোন পদ্ধিতিতে সব-পেয়েছির-দেশ বানিয়ে ফেলতে চাই আমরা । শর্টকাট পদ্ধতির পাওয়ার জেনারেশনের পরিকল্পনা ওপর কি বিপদ ডেকে আনছে কে জানে !

শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর, ২০০৭

আমি আগে থাকতাম উলম নামে একটি ছোট্ট শহরে । উলমের পাশ দিয়ে ডোনাউ (ইংরেজী নাম দানিউব) নদী বয়ে গেছে । এই ডোনাউ নদীর একপাশে বাডেন ঊর্টেমবার্গ প্রদেশ, আরেকপাশে বায়ার্ন (ইংরেজী নাম ব্যাভারিয়া, তিন গোয়েন্দার বোরিস ও রোভার ভ্রাতৃদয়, ও ফুটবল টিম বায়ার্ন ম্যুনশেনের এলাকা এটা) প্রদেশ । নদী পেরোলেই বায়ার্নের যে শহরটা পড়ে সেটাতেই আমি থাকি এখন । শহরের নাম নয়-উলম (ইংরেজীতে নিউ উলম) । এই শহরেরও শেষ প্রান্তে এক আমেরিকান সৈন্যদের পরিত্যক্ত এক ব্যারাকে আমার বাস । বাসে করে পাশের শহরে যেতে ২২ মিনিট লাগে । কাজের জায়গা, ইউনিভার্সিটিতে যেতে দিনের একটা বড় সময় নষ্ট হয় যাতায়াতে ।

পুরো নয়-উলম শহরটাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে । দেখতে বেশ লাগে কিছু জায়গা । মধ্যযুগীয় শহর উলম থেকে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরার প্রতিযোগিতায় নেমেছে যেন এরা । ইউরোপের সবচেয়ে ধনী দেশের সবচেয়ে ধনী স্টেট বলে কথা । আর্থিক দিক দিয়ে ধনী হবার পাশাপাশি স্রষ্টাও এদের দুহাত ভরে সম্পদ দিয়েছেন । পাহাড় নদী লেক কোনটারই কমতি নেই এই প্রদেশে ।

তো, এদের এতো কিছু থাকা সত্ত্বেও গোটা জার্মানীতে এরা একটু আলাদা হিসেবে বিবেচিত । বায়েরিশদের (বায়ার্নের অধিবাসী) গোয়ার স্বভাবই এর জন্য দায়ি মনে হয় । হিটলারের সবচেয়ে শক্ত ঘাটি হিসেবে বায়র্নেরই এক শহর ন্যুর্নব্যর্গ (ইংরেজী উচ্চারন নুরেমবার্গ) বিখ্যাত ছিলো । এই বায়ার্নেরই এক ছোট্ট শহর নয়-উলমে আজকে এক বুস হালটেস্টেলেতে (ইংরেজী, বাস স্টপেজ) বড় করে দুইটি স্বস্তিকা আকা দেখলাম । নিও নাৎসিদের কাজ এগুলো । দেখার সাথেই বুঝলাম উলমের রাস্তা ঘাটে রাতে ঘোরা ফেরা করার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে । আমি জানি আক্রান্ত হলে পুলিশে খবর দিলে ওরা বিদ্যুৎ গতিতে ব্যবস্থা নেবে । নিওনাৎসিটাইপ কাজকর্ম এরা খুব কঠোরহাতে দমন করে । তবুও ঠিক ভরসা আসে না । নিজের স্বার্থেই গুটিসুটি মেরে থাকতে হবে এখন থেকে । স্বস্তিকাচিহ্ণ নিয়ে আগামী সপ্তায় কম্প্লেইন দেবো ঠিক করেছি । ওরা হয়তো এটা মুছে ফেলবে তারপর । কিন্তু এভাবে চিহ্ণ মুছে এদের দমন করা যাবে না । সাউথে আমরা ভালোই শান্তিতে থাকি । নর্থের অবস্থা ভালোই খারাপ । অনেক এলাকায় ফরেইনারদের জন্য নো গো (No Go) এলাকা । ব্যর্লিনে এই সেদিনও জার্মানীতে কনফারেন্সে আসা এক বাঙ্গালী পিএইচডি ছাত্র নিওনাৎসিদের হুঙ্কার শুনে এসেছেন । তাঁর ভাগ্য ভালো তিনি কোনরকম হামলার শিকার হননি । কিছুদিন আগে এই রেসিজম নিয়ে কে যেন একটা পোস্ট করেছিলেন । আমি বলেছিলাম এর থেকেও খারাপ ঘটনা ঘটে । সেগুলো নিয়ে আরেকদিন হবে । আজ এ পর্যন্তই । শোয়েনেস ভোখেনেন্ডে ।

টিকাঃ
১. ভোখেনব্লাট – ভোখেন মানে সপ্তাহ, ব্লাট মানে পৃষ্ঠা
২. ভাফেন এসএস, ইংরেজী আর্মড এসএস । নাৎসি বাহিনীর এলিট ফোর্স এটি । হিটলারের দেহরক্ষি বাহিনী, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প পরিচালনা এবং নিয়মিত সেনাবাহিনীর সাপোর্টের জন্য এলিট কমান্ডো ফোর্সের সৈন্য এই ভাফেন এসএস থেকেই আসতো ।
৩. শোয়েনেস ভোখেনেন্ডে উইকেন্ডের জন্য শুভেচ্ছা ।
৪. আমার ইচ্ছা আছে প্রতি উইকএন্ডে এরকম একটা ভোখেনব্লাট দেবার । দেখা যাক কতদুর নিয়ম রক্ষা করে চলা যায় ।