Text

পিছু ছাড়ছে না খাদ্যসংকট, বরং প্রকট হয়ে উঠছে

২০০৭-০৮ সময়ের খাদ্যসংকট এখনো স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে যায়নি। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব খাদ্যসংকটের মুখে পড়েছিল তখন পুরো বিশ্ব। জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ, পশ্চিমা বিশ্বের বায়োফুয়েলে বিশাল ভর্তুকি, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ অনেক কারণ একত্রে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে সংকট তৈরি করেছিল। ৩০টির বেশি দেশে তখন এ নিয়ে দাঙ্গা হয়।

২০০৮ সালের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমা, বায়োফুয়েল উত্পাদনে ভর্তুকি হ্রাস ইত্যাদি কারণে খাদ্যদ্রব্যের দাম কমতে শুরু করায় সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। তবে সেই স্বস্তি ছিল সাময়িক। বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা খাদ্য নিয়ে নতুন করে চিন্তিত হতে শুরু করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে অন্যতম বৃহত্ ধান ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উত্পাদক ভারতে প্রলম্বিত খরা ও বৃহত্তম চাল রপ্তানিকারক ফিলিপাইনে টাইফুন খাদ্যদ্রব্যের বিশ্ববাজারকে নতুন করে হুমকির মুখে ফেলেছে।

ফিলিপাইনের কৃষিসচিব আরথার ইয়াপ সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই হুমকির দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ২০০৮-এর সংকটের পুনরাবৃত্তি থেকে বিশ্ব বেশি দূরে নয় বলে মত দিয়েছেন। তিনি একটি আন্তর্জাতিক খাদ্য মজুদের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।

ফিলিপাইন এর মধ্যেই তাদের হিসাবে ১০ শতাংশ ঘাটতি পুষিয়ে নিতে চাল আমদানি করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ হিসেবে সাম্প্র্রতিক মৌসুমে পর পর বেশ কয়েকটি ঝড়ের কথা বলা হয়। এ কারণে সাড়ে আট লাখ মেট্রিক টন চাল নষ্ট হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা প্রথম পর্যায়ে চাল আমদানির কথা উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

এ ছাড়া অন্যতম বৃহত্ চাল উত্পাদনকারী দেশ থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম সমপ্রতি তাদের চাল রপ্তানিতে লাগাম দিয়েছে। ফিলিপাইনে ভর্তুকি দিয়ে কমানো নিম্নমানের চাল কিনতে অসংখ্য লোক লাইন দিচ্ছে। সঙ্গে মজুদদারেরাও আরও দাম বাড়ার আশায় চাল মজুদ করছে।

পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ফিলিপাইনের পাশাপাশি ভারত বিশ্ববাজারে বৃহত্ চাল উত্পাদক ও রপ্তানিকারক। সেই ভারত ২০১০ সাল নাগাদ চাল আমদানিকারক দেশে পরিণত হবে। ফিলিপাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ সমরেন্দু মোহান্তি এ প্রসঙ্গে বলেন, এই পরিস্থিতিতে যেকোনো দেশের বাজারে হঠাত্ করে আগুন লাগতে পারে।

a

ভারতে সাম্প্রতিক খরায় ঠিক কতটা শস্যহানি হয়েছে, তার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। তবে ২০০২ সালে একই রকম খরায় ২১ মিলিয়ন মেট্রিক টন শস্যহানির ইতিহাস আছে। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় এ বছর ভারতে নিদেনপক্ষে ২০ মিলিয়ন কম উত্পাদনের আশঙ্কা করাই যায়। সমরেন্দু মোহান্তি ভারতের বিশাল খাদ্য মজুদের কথা উল্লেখ করলেও সেই সঙ্গে এও স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই মজুদের বেশির ভাগই ব্যয় হয় ক্ষুধাপীড়িত দরিদ্র জনগণের ভর্তুকি হিসেবে। এই রিজার্ভ ঘাটতি পুষিয়ে দেবে এমন আশা না করাই ভালো।

গোটা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। ক্রমবর্ধমান খাদ্যের চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর এর জন্য ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ চাল উত্পাদন প্রবৃদ্ধির দরকার পড়ে। এই মুহূর্তে এই বৃদ্ধির হার এক শতাংশেরও কম। মোহান্তি এর জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পানির দুষ্প্রাপ্যতা, বায়োফুয়েলের কাঁচামালের জন্য উত্পাদিত কৃষিপণ্যের চাষ বৃদ্ধি, আবহাওয়ার গুণগত পরিবর্তন ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন।

এশিয়ার প্রধান উত্পাদকদের ছাড়াও ল্যাটিন আমেরিকার উরুগুয়ে, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাও খরার কারণে পাঁচ শতাংশ কম খাদ্যশস্য সরবরাহ করবে। এর মধ্যে ব্রাজিল তাদের আমদানি বাড়িয়ে আট লাখ থেকে নয় লাখ মেট্রিক টন করবে।

এসব খবরই জানান দেয় যে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের পড়তি দাম খুব বেশি দিন থাকবে না। বাড়তি আমদানির চাপ গত বছরের মতো এ বছরও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, যা নতুনভাবে জনগণের বিক্ষোভ উসকে দিতে পারে।

১১ই নভেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত ।
প্রথম আলো লিংক

ট্যাগ: অর্থনীতি
Text

এবার প্রথাবিরোধী দুই অর্থনীতিবিদের নোবেল জয়

এলিনর অসট্রম: ১৯৩৩ সালে জন্ম নেওয়া এলিনর অসট্রম মূলত একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি এযাবত্কালে ঘোষিত অর্থনীতিতে নোবেলজয়ীদের মধ্যে প্রথম নারী। এলিনর অসট্রম এখন আমেরিকার ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ও অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছেন। নোবেল কমিটি তাঁকে তাঁর অর্থনৈতিক প্রশাসন ও বহু গণমালিকানার বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পণ্যের বাজার বিশ্লেষণের জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করেছেন।

এলিনর অসট্রমের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো নব্বইয়ের দশকে বহুপক্ষের মালিকানায় পরিচালিত সম্পদের (যেমন: পার্ক, বনভূমি বা অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা) বিষয়ে গবেষণা। প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী এগুলো সম্পূর্ণ ব্যক্তি অথবা সরকারি মালিকানায় চলতে পারে। তবে অসট্রম দেখিয়েছেন, সরকারি ও বেসরকারি পক্ষের সমন্বয়ে গড়া উচ্চমানের সুপ্রশাসন গণমালিকানায় পরিচালিত ওই সম্পদগুলো পরিচালনায় ভিন্ন মাত্রা দিতে পারে। প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যে প্রতিযোগিতামূলক আচরণ প্রত্যাশা করা হয়, তার বদলে সহযোগিতামূলক প্রশাসনের মাধ্যমে জড়িত সব পক্ষই লাভবান হতে পারে বলে অসট্রম দেখিয়েছেন।

এলিনর অসট্রম গণমালিকানার সম্পদ বলতে সেসব সম্পদকেই বুঝিয়েছেন যেগুলোতে একত্রে অনেকের মালিকানা থাকে। এসবে একজন ভোক্তা বাড়লে সে বাকিদের কাছ থেকে ভোগযোগ্য সম্পদের অংশ নিয়েই সেটা ভোগ করতে পারবে। সেচের পানি, লেক, নদী, পার্ক, সংরক্ষিত জঙ্গল এসবের ভালো উদাহরণ।

অসট্রম দেখিয়েছেন, গণভিত্তিতে ব্যবহার্য সম্পদসমূহ সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলার অসংখ্য সফলতা ও ব্যর্থতার উদাহরণ রয়েছে। অসট্রম ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে গণমালিকানার সম্পদ ব্যবস্থাপনার সাফল্যের শর্ত হিসেবে কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলো: অধিকার সীমা স্পষ্ট, বিরোধ নিষ্পত্তির নির্দেশনা, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির লাভবান হওয়া, সবকিছুর ওপর পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। অসট্রম আরও দেখিয়েছেন ব্যক্তি, করপোরেট ব্যবস্থা বা সরকারি মালিকানা-ব্যবস্থা যেকোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বেশি কার্যকর হতে পারে।

অলিভার উইলিয়ামসন: অলিভার উইলিয়ামসনের জন্ম ১৯৩২ সালে। ষাটের দশকে কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি শেষ করে তিনি ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়াতে অধ্যাপনায় যুক্ত হন। এরপর আশির দশক থেকে অবসর নেওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় (বার্কেলে) অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নোবেল কমিটি অর্থনৈতিক প্রশাসনে তাঁর অবদান ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সীমারেখা বিষয়ে গবেষণার জন্য পদক দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে।

অলিভার উইলিয়ামসনের তৈরি করা তাত্ত্বিক কাঠামো চারটি ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এগুলো হলো: প্রতিযোগিতা ও মুনাফা সর্বোচ্চকরণ নীতি বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে চুক্তি করায়; তৃতীয় কোনো পক্ষের সঙ্গে ক্রেতা বা বিক্রেতার স্বার্থসংশ্লিষ্টতা থাকলে ক্রেতা- বিক্রেতার চুক্তি প্রথম ভিতের মতো নাও হতে পারে; তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি ক্রেতা-বিক্রেতার চুক্তির খরচ বাড়াতে পারে এবং একই পক্ষের ভেতরে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি হলে তৃতীয় পক্ষ উদ্ভূত খরচ কমানো সম্ভব।

প্রথম দুটি ভিত নিয়ে মোটামুটি ঐকমত্য রয়েছে অর্থনীতিবিদদের মহলে। তৃতীয় ভিতটির বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে কেন তৃতীয় পক্ষের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি খরচ বাড়াবে। উইলিয়ামসনের যুক্তি হলো: ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিতে সব পক্ষই যেহেতু চায় উদ্ধৃত মুনাফা সর্বোচ্চ করতে, সেহেতু তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি নতুন উদ্ধৃত মুনাফার খাত তৈরি করবে। তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে ক্রেতা বা বিক্রেতার স্বার্থ জড়িত থাকায় এটা উদ্ধৃত মুনাফা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। উইলিয়ামসন এই উদ্ধৃত মুনাফা নিম্নপর্যায়ে রাখতে একটি অবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে ক্রেতা-বিক্রেতার ভূমিকা একই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হতে হবে। তাহলেই উদ্ধৃত মুনাফার খরচ সীমারেখার মধ্যে রাখা সম্ভব। ক্রেতা-বিক্রেতার এই অবস্থানকে ‘ভার্টিকাল ইন্টিগ্রেশন’ বলেছেন উইলিয়াসন।

তবে এর প্রয়োগের ক্ষেত্র আরও বড়। তার তত্ত্বের প্রয়োগ আধুনিক করপোরেট ফিন্যান্সেও দেখা যায়। আশির দশকের শেষে উইলিয়ামসন দেখিয়েছেন, মূলধনের উত্স বাছাই করতে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ নেবে নাকি শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে শেয়ারের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করবে, সেটা এই ভার্টিকাল বা মুক্ত-স্বাধীন এই তত্ত্বের মাধ্যমে সমাধান করা যায়। শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ করলে সেটার বিনিময়ে তাদের কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ অর্থাত্ প্রশাসনে তাদের অংশ দিতে হয়। অন্যদিকে ঋণ নিলে মূলধনের প্রশাসনে ঋণদাতাদের তখনই কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা যায় যখন কোম্পানি দেউলিয়া হয়। এ জন্য উইলিয়ামসন যেসব সম্পদের মূলধনের উত্স সহজে নির্ধারণ করা যায় সেগুলোর অর্থায়নে ঋণ মূলধন পছন্দ করেছেন। এটি করপোরেট ফিন্যান্স জগতে প্রচলিত ধারণার বিরোধী ।

১৯শে অক্টোবর ২০০৯ তারিখে প্রথম আলোতে প্রকাশিত ।
ইপ্রথমআলো ইমেইজ
প্রথম আলো সাইট লিংক

ট্যাগ: অর্থনীতি
Text

কেন মুক্তবাজার অর্থনীতি স্বাস্থ্যসেবাখাতে কাজ করে না : পল ক্রুগম্যান

(মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওবামা সরকার ক্ষমতা নেবার পর একটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি আবারো সামনে চলে আসে । মুক্তবাজার অর্থনীতির স্বর্গভূমি হিসেবে খ্যাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই খাতটির সমস্যা বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া যায় কিনা সে বিতর্কটি বেশ পুরনো । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবীমা সাধারণত: কর্মস্থল থেকে অথবা নিজ উদ্যোগে কর্পোরেট মালিকানাধীন কোন বীমা কোম্পানির কাছে বীমা করতে হয় । ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায় বীমাকোম্পানী স্বাস্থ্যসেবার পুরো খরচ না পরিশোধ করে আংশিক শোধ করে । একারনে সম্প্রতি মার্কিন জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিতে খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে । এসকল সমস্যা সমাধানে সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা স্বাস্থ্যসেবা খাত সংস্কার প্রস্তাবে একক প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বীমা স্বাস্থ্যবীমা সেবার আবশ্যকতা স্বীকার করেছেন । এর সমর্থনে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান তাঁর ব্লগে কিছু যুক্তি তুলে ধরেছেন । এই নিবন্ধটি সেটারই অনুবাদ ।)

আমার ব্যক্তিগত ব্লগ ও মেইলে আসা বিভিন্ন মন্তব্য পড়ে আমার এরকম একটা ধারনা হয়েছে যে একটি বিশাল সংখ্যক আমেরিকান বিশ্বাস করেন আমেরিকার স্বাস্থ্যসেবা খাতের সমস্যাগুলোর একমাত্র সমাধান রয়েছে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ।

কারো কারো মতে জনগণের এই ধারনাটি প্রথাগত অর্থনীতি শিক্ষার কারনে গেড়ে বসেছে । আমি সেটা মনে করি না । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোরকালের অর্থনৈতিক ধ্যানধারণায় খুব গুরুত্বপূর্ন একটি লেখার কথা এক্ষেত্রে আমরা মনে করতে পারি । লেখাটিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ কেনেথ জে. এ্যারো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দেখিয়েছিলেন কেন ও কিভাবে আমরা স্বাস্থ্যসেবাকে রুটি বা টিভির মতো বাজারে বিক্রি করতে পারি না । আমি এ্যারোর সেই মতটাকেই আমারা মতো করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো ।

krugman
ছবি : পল ক্রুগম্যান

এখানে স্বাস্থ্যখাত প্রসঙ্গে দু’টি বিশেষ দিকের কথা আমি বলতে চাই যেটা প্রমান করবে কেন স্বাস্থ্যখাত হাটবাজারে বিক্রি করা রুটির মতোই আরেকটি পণ্য নয় ।

প্রথমত: কেউ কখনো বলতে পারে না যে একজন ব্যক্তির ঠিক কখন স্বাস্থ্যসেবার দরকার । আবার কিছু ক্ষেত্রে আমরা দেখি যে একজন ব্যক্তি তার কি প্রকার স্বাস্থ্যসেবার দরকার সেটা সে বলতে পারে এবং সাধারণত: সেই সেবা খুব খরচসাপেক্ষ হয়ে থাকে । উদাহরন হিসেবে ট্রিপল করোনারি বাইপাস সার্জারির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে । খুব অল্প সংখ্যক লোক আছেন যারা এই জাতীয় অস্ত্রোপচারের খরচ বহন করার সামর্থ্য রাখেন । এই উদাহরনটি এটাই প্রমান করে যে স্বাস্থ্যসেবা বাজারে বিক্রিযোগ্য রুটি নয় । বাস্তবে খুব কম সংখ্যক সামর্থ্যবান থাকার কারনে এই খরচটা সাধারণত কোন স্বাস্থ্যবীমা কোম্পানী বহন করে থাকে । অর্থাৎ, এখানে বাজারের রুটিক্রেতার মতো ক্রেতা নির্ধারণ করছে না তার কতটাকা কোথায় পরিশোধ করতে হবে । তার হয়ে বীমা কোম্পানী সেটা করছে । এর মানে হলো ভোক্তা পছন্দের মৌলিক ধারনাটা (Consumer preferences) এই স্বাস্থ্যসেবা খাতে অচল ।

সমস্যাটা আরো জটিল আকার পাবে যখন আমরা বীমাকোম্পানির দিকটা ভেবে দেখবো । বীমা কোম্পানির পক্ষে তার গ্রাহকদের স্বাস্থ্যরক্ষা বাবদ বিল পরিশোধ করাটা তার জন্য একটি খরচ । একটি সাধারণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতো তাই তারা চেষ্টা করে গ্রাহকদের বীমাদাবি পরিশোধ না করতে । আবার তারা এই ঝামেলা এড়াতে বীমা করার সময় সেইসব গ্রাহকদেরই পছন্দ করার চেষ্টা করে যারা স্বাস্থ্য বিষয়ে একটু কম ঝুঁকিপূর্ন অবস্থানে রয়েছে । এই দু’টো কারনে প্রাইভেট স্বাস্থ্যবীমা কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয় অনেক বেশী হয়ে থাকে । আবার এদু’টো কারন থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে প্রাইভেট ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলো প্রচুর অর্থ ব্যয় করে থাকে এই ধরনের সমাজ বিধ্বংসী কার্যকলাপে ।

দ্বিতীয়ত: স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে আমরা ভোক্তা হিসেবে বাজারে পণ্য কেনার সময় যে অভিজ্ঞতা আর বিভিন্ন জিনিসের মধ্যে তুলনা কাজে লাগাই সেরকমটি করতে পারি না । স্বাস্থ্যসেবায় একই পণ্যের বিভিন্ন মান ঠেকাতেই চিকিৎসকদের একটি কোড অব কনডাক্ট মেনে চলতে হয় । এটা সবার জন্য সমান চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযোগ তৈরীর জন্য জরুরী । চিকিৎসকদের সাথে রুটি বা মুদিদোকানদারের সাথে এটি একটা বিরাট পার্থক্য ।

উপরের ব্যাখ্যা করা দু’টি দিক পর্যালোচনা করলে দেখা যায় স্বাস্থ্যসেবাখাত প্রচলিত বাজারভিত্তিক তত্ত্ব দিয়ে চালানো সম্ভব নয় । এ সত্ত্বেও আমাদের মনে রাখতে হবে সোশালাইজড ঔষধ বা একক প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বীমাসেবাই একমাত্র বাস্তব সমাধান নয় । আমাদের সামনে বিভিন্ন দেশে প্রচলিত স্বাস্থ্যসেবার অনেক সফল মডেল রয়েছে ও সেগুলো একটি একেকটি থেকে সুস্পষ্টভাবে ভিন্ন । এবং এই সফল স্বাস্থ্যসেবা মডেলগুলোর কোনটিই মুক্তবাজার অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত নয় শুধুমাত্র একটি কারনে – স্বাস্থ্যসেবাখাতে মুক্তবাজার ধারণা কাজ করে না । এর ভিত্তিতে বলা যায় যারা স্বাস্থ্যসেবা খাতে মুক্তবাজার সমর্থন করেন তারা যুগপৎ তত্ত্ব ও বাস্তবতাকে অস্বীকার করেই সেটা করেন ।

অনুবাদ : হাসিব মাহমুদ । প্রথম আলো পত্রিকায় ৩রা অগাস্ট, ২০০৯ তারিখে প্রকাশিত

Text

একটি নেতৃত্বহীন মহাদেশের কথা : পল ক্রুগম্যান

আমি ইউরোপ নিয়ে সত্যিকার অর্থেই চিন্তিত । আরো সত্য হলো আমি গোটা পৃথিবীটা নিয়েই চিন্তিত । চলমান অর্থনৈতিক মন্দা থেকে গোটা পৃথিবীতে কেউই নিরাপদ স্বর্গে বাস কর‌ছে না । তা সত্ত্বেও আমি মার্কিন যুক্তরাস্ট্র অপেক্ষা ইউরোপ নিয়ে বেশি চিন্তিত ।

এটা প্রথমেই পরিস্কার করে নেয়া ভালো যে আমি এখানে গড়পড়তা আমেরিকানদের মতো ইউরোপের উচ্চ করের হার বা সরকার নিয়ন্ত্রিত সামাজিক সেবাখাত নিয়ে অভিযোগ কর‌ছি না । বড় ওয়েলফেয়ার স্টেটগুলো ইউরোপের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দায়ি নয় । প্রকৃতপক্ষে আমি ওখানে সরকার নিয়ন্ত্রিত ওয়েলফেয়ার সিস্টেম যে এই সংকটা কাটাতে ভূমিকা রাখছে সেটাই বলার চেষ্টা করবো ।

ইউরোপের চলমান সংকট রাজস্ব ও মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিকেই অত্যন্ত মারাত্মক আকার ধারন করেছে । গুরুত্ব বিচারে এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুলনা করা যেতে পারে । তবে ইউরোপিয় ইউনিয়ন এই সংকট মোকাবেলায় গৃহীত পদক্ষেপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে খুব বেশী রকমের পিছিয়ে আছে ।

প্রথমত রাজস্ব নীতির কথা বলা যায় । এখানে অনেক অর্থনীতিবিদের মতো আমি নিজেও মনে করি পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওবামা সরকারের গৃহীত স্টিমুলাস প্যাকেজ যথেষ্ট নয় । তবে এই স্টিমুলাস প্যাকেজ প্রশ্নটিতে ইউরোপের তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুতই সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছে ।

দ্বিতীয়ত, মুদ্রা নীতিতেও সেই একই পিছিয়ে পড়ার গল্প রয়েছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে ইউরোপিয় ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টতই পিছিয়ে আছে । ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক সুদের হার কমাতে খুব দ্রুতই এগিয়ে এসেছে । অন্যদিকে ইউরোপিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটা করতে অনেক গড়িমসি করেছে । এমনকি গত বছরের জুলাইতে তারা এই হার বাড়িয়েছে পর্যন্ত !

krugman

তবে এই চলমান সংকটে ইউরোপিয় ইউনিয়ন তাদের যে বিষয়টি নিয়ে এগিয়ে থাকবে সেটা হলো তাদের সদস্য দেশগুলোতে সরকার নিয়ন্ত্রিত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা । এই সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যক্তিপর্যায়ে অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব সীমিত রাখতে সাহায্য করবে । এই সামাজিক নিরাপত্তা খুব ছোট ব্যাপার নয় । সবার জন্য নিশ্চিত স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা, চাকরি হারানো সবার জন্য বেকার ভাতা নিশ্চিতভাবেই অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব ব্যক্তিগত পর্যায়ে কমিয়ে আনবে । এবং এই সরকারি সুবিধাগুলো ভোক্তাদের বাজারে অর্থব্যয়ের সুযোগ তৈরী করে দেয় যেটা শেষ বিচারে অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আনে ।

তবে এইসব স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থেকে এই মুহুর্তে যেটা দরকার সেটা হলো সরকারের এগিয়ে আসা । এবং ইউরোপ এদিক দিয়ে পিছিয়ে আছে ।

প্রশ্ন উঠতে পারে ইউরোপ এভাবে পিছিয়ে পড়লো কেন । অদক্ষ নেতৃত্ব এটার একটা কারন হিসেবে আমরা ধরতে পারি । ইউরোপের ব্যাংকিং সেক্টরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা চলমান অবস্থার গুরুত্ব বুঝতে পুরোটাই ব্যর্থতা দেখিয়ে চলেছেন । নিজেদের সাফল্যের কীর্তি প্রচারেই তাদের আগ্রহ বেশী । জার্মান অর্থমন্ত্রীর জুড়ি মেলা, যিনি এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না ও যার কথা শোনা সময় নষ্ট, এই আমেরিকাতে রিপাবলিকানদের মধ্যেই সম্ভব ।

তবে এর থেকেও বড় সমস্যা রয়ে গেছে । ইউরোপের অর্থনৈতিক একত্রিকরণ তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একত্রিকরণ থেকে বহুদুর পিছিয়ে আছে । প্রায় গোটা ইউরোপের অর্থব্যবস্থা একই মুদ্রায় চলে এবং তাদের মধ্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক সহজেই আমেরিকার এক প্রদেশ থেকে আরেক প্রদেশের সম্পর্কের সাথে তুলনা করা যায় । তা সত্ত্বেও ইউরোপের নেতারা এই অর্থনৈতিক সুসম্পর্ককে রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন । এই ঐক্যের অভাব বড় বেশী টের পাওয়া যাচ্ছে এই মন্দাসময়ে ।

এই সমস্যাটাই সংকট মোকাবেলায় রাজস্ব নীতির অচলাবস্থার জন্য দায়ি করা যেতে পারে । কোন সরকারই ইউরোপের সম্মিলিত স্টিমুলাস প্যাকেজে বেশী টাকা ঢালতে রাজি নন । কারন ঐ টাকা তাদের নিজের দেশের নাগরিকদের কোন কাজে নাও লাগতে পারে ।

অন্যদিকে মুদ্রানীতিতে এতোটা জটিলতা না থাকলেও সেখানেও যথেষ্ট কর্মতৎপরতার অভাব দেখা যায় । ইউরোপিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মতো সহজেই স্বাধীনভাবে একটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে পারেনা । সেখানে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সারাক্ষনই ১৬টি দেশের প্রতিনিধিদের বাদানুবাদ লেগে থাকে যার ফলশ্রুতিতে অনিবার্যভাবেই কালক্ষেপন দেখা দেয় ।

ইউরোপ এসব কারনে এরকম সংকটকালে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল সংগঠন হিসেবে দেখা দিচ্ছে ।

ইউরোপিয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়বে গত কয়েক বছরে যেসব দেশ সহজেই আয়-রোজগার করতে পেরেছে । উদাহরনস্বরূপ স্পেনের কথা বলা যায় । স্পেনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের সাথে তুলনা করা যায় । গত প্রায় এক দশক ধরে নির্মান খাতে ফ্লোরিডা ও স্পেন এই খাতে প্রচুর বিনিয়োগের দেখা পায় । এই খাতটি ধ্বসে পড়ার পর স্পেন ও ফ্লোরিডা দুইজায়গাতেই এখন চিন্তা এই খাতে কাজ করা কর্মিদের কিভাবে অন্য সেক্টরে কর্মসংস্থান করা যাবে । তবে এক্ষেত্রে স্পেনের সমস্যাটা আরেকটু গুরুতর । অন্য কোন দেশ হলে তারা হয়তো তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করে পরিস্থিতি সামাল দেবার চেষ্টা করতে পারতো । কিন্তু স্পেন ইউরোপিয় ইউনিয়নের সদস্য হবার কারনে তাদের সে সুযোগ নেই । একমাত্র রাস্তা তাদের হাতে যেটা খোলা আছে সেটা হলো মজুরীর হার কমিয়ে আনা যেটা রাজনৈতিকভাবেও একটা কঠিন সিদ্ধান্ত । স্পেনের মতো পুরো ইউরোপিয় ইউনিয়নই একটি দীর্ঘস্থায়ী মন্দাকালে আটকে যাবে এই সম্ভাবনা এখনই ফুটে উঠতে শুরু করেছে ।

তবে এসব কি এটাই প্রমান করে যে ইউরোপ তাদের একত্রিকরণের সিদ্ধান্তে ভুল ছিলো ? বা এটা কি প্রমান করে যে একক মুদ্রা হিসেবে ইউরোর প্রচলন ভুল পদক্ষেপ ছিলো ? হয়তো ।

কিন্তু ইউরোপ এখনো সন্দেহবাদিদের ভুল প্রমানিত করার ক্ষমতা রাখে । দরকার শুধু ইউরোপের রাজনীতিবিদদের শক্ত হাতে নেতৃত্ব দেয়া । কিন্তু তারা ওটা করতে পারবে কি ?

পল ক্রুগম্যান একজন মার্কিন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ । তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন । এই নিবন্ধটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে পল ক্রুগম্যানে অপ-এড কলামে প্রকাশিত হয়েছে ।
অনুবাদটি প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে ।

Text

মন্দা মোকাবেলায় ইউরোপিয় সামাজিক নিরাপত্তা বলয়

গত মাসে জার্মানির ফ্রাঙ্ক কোপে তার ছোট কোম্পানির সবাইকে মিটিঙে ডেকেছিলেন । মিটিঙে বরাবরের মতো হালকা আপ্যায়নের সাথে ছিলো ছোট্ট একটি দুঃসংবাদ ।দুঃসংবাদটি হলো আগের সাপ্তাহিক ৪০ঘন্টার বদলে এখন থেকে সবাইকে তার অর্ধেক ২০ ঘন্টা কাজ করতে হবে ।এই ধরনের দুঃসংবাদ জার্মানিতে এখনকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিবেচনায় নতুন কিছু নয় ।পুরো পৃথিবী জুড়েই এধরনের ঘটনা এখন স্বাভাবিকে পরিণত হয়েছে ।

তবে অন্য দেশের মতো এখানকার কর্মচারিরা পুরো চাকরি হারাচ্ছেন না । কর্মচারিদের পুরোপুরি ছাটাইয়ের বদলে এখানকার সরকার ছোট বড় সমস্ত কোম্পানিকে কর্মচারিদের কাজের ঘন্টা কমিয়ে দিতে উৎসাহিত করছেন ।কমে যাওয়া ঘন্টায় একজন কর্মচারি যেই বেতন পেতেন তার দুই তৃতীয়াংশ সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হচ্ছে । জার্মানিতে এই পদ্ধতিকে কুর্ৎযআরবাইট বা ‘সংক্ষিপ্ত কাজ’ নাম দেয়া হয়েছে ।

eu

এই ধরনের পদ্ধতিই ইউরোপিয় ইউনিয়নের সাথে বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মন্দা মোকাবেলায় অনুসৃত পদ্ধতিতে পার্থক্য এনে দিচ্ছে । কর্পোরেট সেক্টরে প্রণোদনা প্রশ্নে একমত হলেও সামাজিক অনুৎপাদনশীল প্রণোদনা প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে তাদেরই মতো একটি সঙ্ঘবদ্ধ নীতির আওতায় প্রতিটি সদস্য দেশের জন্য প্রণোদনামূলক রাজস্বনীতি অনুসরন করতে বলছে । প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইউরোপিয় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বর্তমান প্রেসিডেন্ট চেক রিপাবলিকের মিরেক টোপোলানেক এই পদ্ধতিকে ‘নরকের দরজায় যাবার রাস্তা’ বলে অভিহিত করেছেন ।এবং এই প্রণোদনা কিভাবে দেয়া উচিত এই প্রশ্নে ইউরোপিয় নেতারা মোটামুটিভাবে চেক প্রধানমন্ত্রির সাথে একমত ।
সামাজিক অনুৎপাদনশীল খাতে আরোও সরাসরি প্রণোদনামূলক প্যাকেজের বদলে ইউরোপিয় ইউনিয়নের নেতারা বলছেন দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা তাদের সামাজিক নিরাপত্তা বলয় পদ্ধতির আওতা বাড়ানোর মাধ্যমেই তারা এই বিপর্যয় সামাল দিতে পারবেন ।এই সামাজিক নিরাপত্তা বলয়কে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেয়া সামাজিক খাতে সরাসরি আর্থিক প্রনোদনার চেয়ে বেশী কার্যকরি মনে করছেন ।
এ বিষয়ে উদাহরন দিতে গিয়ে মিউনিখভিত্তিক ইস্টিটিউট ফর ইকনোমিক রিসার্চের প্রেসিডেন্ট হান্স-ভেরনার সিন বলছেন – “সামাজিক নিরাপত্তার বলয়ে চালু করা কুর্ৎযআরবাইট বা “সংক্ষিপ্ত কাজ“ জার্মানিতে কর্মচারিদের দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানিগুলোর সাথে সম্পৃক্ত রাখবে যেটা তাদের আয়ের পথ খোলা রাখবে । এই আয়ের পথই তাদের কেনাকাটার বাজেটকে সচল রাখবে । এবং অর্থনীতির নিয়ম অনুসারে এটিই কোম্পানিগুলোকে উৎপাদনে যুক্ত রাখার অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে ।
জার্মান ফেডারেল অফিসের আনুমানিক হিসেবে এবছর তারা ২.৮৫ বিলিয়ন ডলার এই কুর্ৎযআরবাইট বা ‘সংক্ষিপ্ত কাজ খাতে খরচ করবে । গত বছর এই পরিমান ছিলো মাত্র ২৭০ মিলিয়ন ডলার । উপরন্তু পুর্ববর্তি ৬ মাসের পরিবর্তে এই প্রকল্পের মেয়াদ কর্মচারিপ্রতি ৬ মাসের বদলে বাড়িয়ে ১৮ মাস করা হয়েছে ।পরিমান হিসেবে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল প্রণোদনামূলক প্যাকেজের তুলনায় কম হলেও জার্মান লেবার অফিস দাবি করছে কোম্পানিগুলোর আর্থিক চাপের সাথে সরকারের সম্মিলিত অংশগ্রহন দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানিগুলোকে তাদের দীর্ঘদিনের দক্ষ কর্মশক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করবে যেটা প্রকারান্তরে মন্দাসময়ে জার্মান জনগণের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে সাহায্য করবে ।
জার্মানিতে বিভিন্ন প্রণোদনামূলক পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পরে শুরু করলেও বার্কলেইয ক্যাপিটাল লন্ডনের চিফ ইকোনমিস্ট জুলিয়ান কালোউয়ের মতে জার্মানির প্রনোদনামূলক পদক্ষেপ অনেক তাড়াতাড়ি অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে । উদাহরন দিতে গিয়ে তিনি গাড়ি কেনায় সরকারি প্রনোদনার প্রসঙ্গে বলেছেন গত ফেব্রুয়ারি মাসে গাড়ি বিক্রয়ের পরিমান ২২% বৃদ্ধি পেয়েছে । এটা সম্ভব হয়েছে সরকারের সহায়তায় জার্মান জনগণের আয়ের পরিমান ধরে রাখতে পারার কারনে ।এই আয় ধরে রাখতে সক্ষম হওয়াটা শেষ বিচারে জার্মান অর্থনীতির অন্যতম মূল স্তম্ভ গাড়িনির্মান শিল্পের আয় বাড়িয়ে পুরো দেশের মন্দা কাটাতে ভূমিকা রাখছে ।
অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মন্দাগ্রস্থ মাঝারি ও ছোট কোম্পানিগুলো সরকারি সহায়তার অভাবে ছাটাইকেই একমাত্র সমাধান বলে মনে করতে বাধ্য হচ্ছে । একের পর এক ছাটাইতে মার্কিনিদের আয় কমছে যেটা পরবর্তিতে বাজার চাহিদার সংকোচনের প্রভাব ফেলছে ।বাজার চাহিদার সংকোচনের প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়া অবশ্যম্ভাবি ।
তবে জার্মানি তথা গোটা ইউরোপিয় ইউনিয়নের সংকটমোচন পদ্ধতির সমালোচক শুধু মার্কিন সরকারই নয় । ওয়াশিংটন ভিত্তিক পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্সের ডেপুটি ডিরেক্টর এ্যাডাম পোসেনও জার্মান সরকারের আরোও বেশি প্রনোদনামূলক পদক্ষেপের জন্য জোর দিয়েছেন ।কারন হিসেবে তিনি জার্মান অর্থনীতির অতিমাত্রায় রপ্তানী নির্ভরতার কথা বলেছেন ।তার মতে জার্মান পন্য আমদানিকারকদের অর্থনীতির ওপরই জার্মান অর্থনীতি দাড়িয়ে আছে । ইউরোপিয় ইউনিয়নের সম্মিলিত প্রনোদনা প্যাকেজে একারনে তাদের আরো বেশি (এ মুহুর্তে তাতে জার্মান অংশ শতকরা ৩৭ভাগ )করে অংশ নেয়া উচিত যাতে করে তারা জার্মানি থেকে তাদের আমদানির চাকা সচল রাখতে পারে ।
এসব সমালোচনা সত্ত্বেও জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মার্কেল গত মাসে এক টিভি সাক্ষাতকারে বলেছেন – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় জার্মান অর্থনীতি এখনো তেমনভাবে মন্দায় প্রভাবিত হয়নি । উদাহরন দিতে গিয়ে তিনি মন্দার মধ্যেও পেনশন ফান্ড, বেকারভাতা, মুদ্রা বিনিময়ের স্থিতিশীলতার কথা বলে এর কৃতিত্ব সামাজিক নিরাপত্তা পদ্ধতিকেই দিয়েছেন ।মার্কেলের সাথে সাথে ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানিতে সরকার ও মিডিয়া নানারকম আশার বানী শোনালেও বাস্তব পরিসংখ্যান অতোটা আশার আলো দেখায় না ।কমার্ৎযব্যাংকের মতে জার্মান অর্থনীতি চলতি বছরে ৬ থেকে ৭ শতাংশ সঙ্কুচিত হতে পারে যা পুর্ববর্তী অনুমানের চাইতে দ্বীগুন ।অর্থনীতির মন্দা থেকে জার্মানির তথা ইউরোপিয় ইউনিয়নের সামাজিক নিরাপত্তা বলয় জনগণকে আর কতোদিন দুরে রাখতে পারবে সেটাই প্রশ্ন এখন ।

(নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত কলামের ভিত্তিতে লিখিত ও প্রথম আলো-তে প্রকাশিত ।)