সাধারণভাবে বলতে গেলে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় অর্থনীতিবিদেরা বেশ কয়েকটি অনুমিতি ধরে নেন। এর মধ্যে পরিবহন খরচ, সরকারি নিয়ন্ত্রণের অনুপস্থিতি, ভোক্তার কাছে সব তথ্যের প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য। এসব অনুমিতির ভিত্তিতেই বাজারব্যবস্থা সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে—এ রকম একটি ধারণা তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। তারপর এটা আজ একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে এই মুক্তবাজার-ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে বা বাজারের ভিত মজবুত রাখতে একে বাইরে থেকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ বা অন্য কথায় একটি গভর্নেন্স বা প্রশাসনের আওতাধীন রাখা অপরিহার্য। এই গভর্নেন্স বা প্রশাসন সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক খাতে আইন তৈরি করে সেখানকার পণ্য বিনিময় ও পণ্যের ওপর তার মালিকের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। একইভাবে আইনপ্রণেতারা সরকারের ভেতরে থেকে এর বিভিন্ন সেবামূলক কাজকর্ম ও যেসব জননিরাপত্তামূলক বিষয় (প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য) বাজার অর্থনীতির আওতার বাইরে সেগুলোও তত্ত্বাবধান করতে পারেন। এই গভর্নেন্স বা প্রশাসন নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এ রকম দুজন গবেষক এলিনর অসট্রম ও অলিভার উইলিয়ামসন এ বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।
এলিনর অসট্রম: ১৯৩৩ সালে জন্ম নেওয়া এলিনর অসট্রম মূলত একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি এযাবত্কালে ঘোষিত অর্থনীতিতে নোবেলজয়ীদের মধ্যে প্রথম নারী। এলিনর অসট্রম এখন আমেরিকার ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ও অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছেন। নোবেল কমিটি তাঁকে তাঁর অর্থনৈতিক প্রশাসন ও বহু গণমালিকানার বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পণ্যের বাজার বিশ্লেষণের জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করেছেন।
এলিনর অসট্রমের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো নব্বইয়ের দশকে বহুপক্ষের মালিকানায় পরিচালিত সম্পদের (যেমন: পার্ক, বনভূমি বা অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা) বিষয়ে গবেষণা। প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী এগুলো সম্পূর্ণ ব্যক্তি অথবা সরকারি মালিকানায় চলতে পারে। তবে অসট্রম দেখিয়েছেন, সরকারি ও বেসরকারি পক্ষের সমন্বয়ে গড়া উচ্চমানের সুপ্রশাসন গণমালিকানায় পরিচালিত ওই সম্পদগুলো পরিচালনায় ভিন্ন মাত্রা দিতে পারে। প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যে প্রতিযোগিতামূলক আচরণ প্রত্যাশা করা হয়, তার বদলে সহযোগিতামূলক প্রশাসনের মাধ্যমে জড়িত সব পক্ষই লাভবান হতে পারে বলে অসট্রম দেখিয়েছেন।
এলিনর অসট্রম গণমালিকানার সম্পদ বলতে সেসব সম্পদকেই বুঝিয়েছেন যেগুলোতে একত্রে অনেকের মালিকানা থাকে। এসবে একজন ভোক্তা বাড়লে সে বাকিদের কাছ থেকে ভোগযোগ্য সম্পদের অংশ নিয়েই সেটা ভোগ করতে পারবে। সেচের পানি, লেক, নদী, পার্ক, সংরক্ষিত জঙ্গল এসবের ভালো উদাহরণ।
অসট্রম দেখিয়েছেন, গণভিত্তিতে ব্যবহার্য সম্পদসমূহ সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলার অসংখ্য সফলতা ও ব্যর্থতার উদাহরণ রয়েছে। অসট্রম ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে গণমালিকানার সম্পদ ব্যবস্থাপনার সাফল্যের শর্ত হিসেবে কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলো: অধিকার সীমা স্পষ্ট, বিরোধ নিষ্পত্তির নির্দেশনা, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির লাভবান হওয়া, সবকিছুর ওপর পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। অসট্রম আরও দেখিয়েছেন ব্যক্তি, করপোরেট ব্যবস্থা বা সরকারি মালিকানা-ব্যবস্থা যেকোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বেশি কার্যকর হতে পারে।
অলিভার উইলিয়ামসন: অলিভার উইলিয়ামসনের জন্ম ১৯৩২ সালে। ষাটের দশকে কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি শেষ করে তিনি ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়াতে অধ্যাপনায় যুক্ত হন। এরপর আশির দশক থেকে অবসর নেওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় (বার্কেলে) অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নোবেল কমিটি অর্থনৈতিক প্রশাসনে তাঁর অবদান ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সীমারেখা বিষয়ে গবেষণার জন্য পদক দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে।
অলিভার উইলিয়ামসনের তৈরি করা তাত্ত্বিক কাঠামো চারটি ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এগুলো হলো: প্রতিযোগিতা ও মুনাফা সর্বোচ্চকরণ নীতি বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে চুক্তি করায়; তৃতীয় কোনো পক্ষের সঙ্গে ক্রেতা বা বিক্রেতার স্বার্থসংশ্লিষ্টতা থাকলে ক্রেতা- বিক্রেতার চুক্তি প্রথম ভিতের মতো নাও হতে পারে; তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি ক্রেতা-বিক্রেতার চুক্তির খরচ বাড়াতে পারে এবং একই পক্ষের ভেতরে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি হলে তৃতীয় পক্ষ উদ্ভূত খরচ কমানো সম্ভব।
প্রথম দুটি ভিত নিয়ে মোটামুটি ঐকমত্য রয়েছে অর্থনীতিবিদদের মহলে। তৃতীয় ভিতটির বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে কেন তৃতীয় পক্ষের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি খরচ বাড়াবে। উইলিয়ামসনের যুক্তি হলো: ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিতে সব পক্ষই যেহেতু চায় উদ্ধৃত মুনাফা সর্বোচ্চ করতে, সেহেতু তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি নতুন উদ্ধৃত মুনাফার খাত তৈরি করবে। তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে ক্রেতা বা বিক্রেতার স্বার্থ জড়িত থাকায় এটা উদ্ধৃত মুনাফা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। উইলিয়ামসন এই উদ্ধৃত মুনাফা নিম্নপর্যায়ে রাখতে একটি অবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে ক্রেতা-বিক্রেতার ভূমিকা একই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হতে হবে। তাহলেই উদ্ধৃত মুনাফার খরচ সীমারেখার মধ্যে রাখা সম্ভব। ক্রেতা-বিক্রেতার এই অবস্থানকে ‘ভার্টিকাল ইন্টিগ্রেশন’ বলেছেন উইলিয়াসন।
তবে এর প্রয়োগের ক্ষেত্র আরও বড়। তার তত্ত্বের প্রয়োগ আধুনিক করপোরেট ফিন্যান্সেও দেখা যায়। আশির দশকের শেষে উইলিয়ামসন দেখিয়েছেন, মূলধনের উত্স বাছাই করতে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ নেবে নাকি শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে শেয়ারের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করবে, সেটা এই ভার্টিকাল বা মুক্ত-স্বাধীন এই তত্ত্বের মাধ্যমে সমাধান করা যায়। শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ করলে সেটার বিনিময়ে তাদের কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ অর্থাত্ প্রশাসনে তাদের অংশ দিতে হয়। অন্যদিকে ঋণ নিলে মূলধনের প্রশাসনে ঋণদাতাদের তখনই কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা যায় যখন কোম্পানি দেউলিয়া হয়। এ জন্য উইলিয়ামসন যেসব সম্পদের মূলধনের উত্স সহজে নির্ধারণ করা যায় সেগুলোর অর্থায়নে ঋণ মূলধন পছন্দ করেছেন। এটি করপোরেট ফিন্যান্স জগতে প্রচলিত ধারণার বিরোধী ।
১৯শে অক্টোবর ২০০৯ তারিখে প্রথম আলোতে প্রকাশিত ।
ইপ্রথমআলো ইমেইজ ।
প্রথম আলো সাইট লিংক ।